সময়টা ২০২০ সালের জুন মাস। করোনাভাইরাসের প্রকোপ ঠেকাতে দেশে লকডাউন। রাজধানীর ধানমন্ডি রেড জোন এলাকা হওয়ায় সেখানে আরও কড়াকড়ি। অন্যান্য সবার মতো ছাত্রদল নেত্রী জান্নাতুল নওরীন উর্মিও তখন ঘরবন্দি। বইপড়া, টেলিভিশন দেখাই দৈনন্দিন রুটিন। এমন পরিস্থিতিতে সমাজের অসহায়-ছিন্নমূল মানুষ নিয়ে টেলিভিশনের একটি খবর উর্মির মনোজগতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে, যা পরবর্তী জীবনে তার চিন্তাভাবনাকে আমূল পাল্টে দেয়।
খবরে নওরীন দেখতে পান- লকডাউন ঘোষণার পর শহর ফাঁকা হয়ে গেছে, প্রায় সবাই নিজ নিজ বাসায় অবস্থান করছেন। কিন্তু কিছু মানুষ এখনও ফুটপাতে রয়েছেন, কারণ তাদের যাবার জায়গা নেই, ফুটপাতই তাদের ঠিকানা। কিন্তু তারও চেয়েও বড় সমস্যা হচ্ছে ছিন্নমূল এসব মানুষ সাধারণত ভিক্ষা বা অন্যদের দেওয়া খাবারের ওপর নির্ভর করতেন। কিন্তু এখন রাস্তায় মানুষ না থাকায় তারা ভিক্ষা বা খাবার কিছুই পাচ্ছেন না। এতে তাদেরকে প্রায় অনাহারে থাকতে হচ্ছে।
প্রতিবেদনে একটি বাচ্চাকে খাবার দিতে না পারা একজন শীর্ণকায় নারীকে কাঁদতে দেখা যায়। তিনি ওই নারীকে চিনতে পারেন। ধানমন্ডির জিগাতলা তার বাসা ও সীমান্ত স্কয়ারের আশেপাশে ওই নারীকে বাচ্চা নিয়ে ভিক্ষা করতে দেখেছেন বহুবার। স্বাভাবিক পরিস্থিতির সময়ে তিনি কখনও এদের সম্পর্কে আগ্রহ দেখাননি। কিন্তু খবরে দেখানো এই দৃশ্য ভেতর থেকে নওরীনকে আরও অস্থির করে তোলে।

নওরীন জানান, তিনি বিষয়টি পরিবারের সঙ্গে আলাপ করেন এবং ওই নারীকে সাহায্য করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু নওরীন তখনও বেশ অসুস্থ। টানা তিন মাস হাসপাতালে থাকার পর কয়েকদিন হলো বাসায় ফিরেছেন।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী নওরীনের জীবনে তখনও তাজা একটি দুঃসহ স্মৃতি। শুধু ছাত্রদল করার কারণে বিভাগের শিক্ষক সুজিত বালার মদদে ২০২০ সালের ১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নওরীনের ওপর নেমে আসে ছাত্রলীগের নির্মম নির্যাতন। ছাত্রলীগ নেতা আলিম সালেহী, আরিফুল ইসলাম, ফিরোজ, হাফিজ, আসাদুজ্জামান আসাদসহ মোট ৮ ছাত্রলীগ নেতাকর্মী তার মাথায় আঘাত করে, নির্মমভাবে পেটায়। সারা শরীরে জ্যামিতি বক্সের কাঁটাকম্পাস দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করে; গলার চামড়ায় দাগ কাটে। পেন্সিল ভেঙে অর্ধেকটা বুকে ঢুকিয়ে দেয়, ভেঙে দেয় পা। গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। ফলে শারীরিক দুর্বলতা আর সংক্রমণের ঝুঁকি; সব মিলিয়ে পরিবার প্রথমে তাকে বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেয়।
তবু থেমে থাকেননি নওরীন
অনেক কষ্টে বাবা–মাকে বুঝিয়ে সেদিন স্বাস্থ্যবিধি মেনে বের হই, খোঁজ নিতে নিতে শেষ পর্যন্ত সেই নারীকে খুঁজে পাই। তার অবস্থা সত্যিই খুব খারাপ ছিল। ভেতর থেকে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম, স্মৃতিচারণা করে বলেন তিনি।
কিন্তু সেদিন আরও বড় এক বাস্তবতার মুখোমুখি হন নওরীন
আমি আসলে শুধু ওই মা ও শিশুটির জন্য কিছু খাবার নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু দেখি তাদের মতো আরও অনেক মানুষ তখনও ফুটপাতে বসবাস করেন। তারা সবাই আমাকে ঘিরে ধরলেন; খাবার, পানি বা একটু সাহায্যের আশায়। তখন খুব বিব্রত হয়েছিলাম। মনে হয়েছিল আমি কতটা অপ্রস্তুত। আর তখনই সিদ্ধান্ত নিই—যেভাবেই হোক, এদের পাশে দাঁড়াতে হবে, যোগ করেন তিনি।

এরপর আর থামেননি নওরীন। পরিবারের নারী হোস্টেল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রান্নাঘরকে কাজে লাগিয়ে প্রতিদিন ছিন্নমূল মানুষের জন্য রান্না করে খাবার বিতরণ শুরু করেন। প্রয়োজন অনুযায়ী কাপড়, ওষুধ এমনকি কখনও আর্থিক সহায়তাও দেন। ধীরে ধীরে তার এই উদ্যোগে শক্তভাবে পাশে দাঁড়ায় পরিবারও।
এক সময় করোনার প্রকোপ ধীরে ধীরে কমে আসে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। ছিন্নমূল মানুষগুলো আবারও সাধারণ মানুষের সহায়তা পেতে শুরু করেন। তখন নওরীনও ধীরে ধীরে প্রতিদিনের উদ্যোগ গুটিয়ে নেন।
তবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সেই অনুভূতি থেমে যায়নি

সেই সিদ্ধান্তের পর কেটে গেছে অর্ধযুগ। কিন্তু ছিন্নমূল মানুষের কথা ভুলে যাননি তিনি। সারা বছর টিউশনি করে উপার্জিত টাকার একটি অংশ জমিয়ে গত ছয় বছর ধরে রমজান মাসে দুস্থ মানুষের মধ্যে নিয়মিত ইফতার বিতরণ করছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক জান্নাতুল নওরীন উর্মি।

নওরীন বলেন, সারা বছর এভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়া আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়ালে যে আনন্দ পাই, সেটা অন্য রকম। তাই ভাবলাম অন্তত রমজান মাসে যেন তাদের পাশে থাকতে পারি; রমজান মাসে অন্তত যেন ছিন্নমূল মানুষগুলো একটু ভালোভাবে ইফতার করতে পারেন— এই চিন্তা থেকেই প্রতি বছর উদ্যোগটা চালিয়ে যাচ্ছি।

এই কাজে তার পরিবারের সদস্যরাও সক্রিয়ভাবে যুক্ত। রান্না, প্যাকেজিং ও বিতরণ; সব কাজেই তারা একসঙ্গে অংশ নেন। ফলে স্বল্প পরিসরে শুরু হওয়া উদ্যোগ আজ স্থায়ী রূপ পেতে শুরু করেছে। যদিও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই খাবার বিতরণ করতে গিয়েও তাকে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।
সমাজের মানুষের প্রতি আমাদের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব রয়েছে মন্তব্য করে নওরীন আরও বলেন, ‘আমি মনে করি সমাজে যদি আমরা প্রত্যেকে নিজের জায়গা থেকে একটু করে দায়িত্ব নিই, তাহলে অনেক কষ্টই কমানো সম্ভব। আমি বড় কোনো কাজ করছি না, শুধু চেষ্টা করছি আমার সামর্থ্যের ভেতরে কিছু মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে।’
তার ভাষ্য, মানবিক উদ্যোগ কখনো রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বিবেচনার কারণে বাধাগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়। বরং দল, মত বা ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক বাংলাদেশ গঠনে সবার এগিয়ে আসা উচিত।
আরটিভি/এমএইচজে





