সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ০৭:০৩ পিএম
রমজান মাস মুসলমানদের জন্য শুধু একটি ইবাদতের সময় নয়, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ অনুগ্রহ ও প্রশিক্ষণের মাস। ইসলামি বর্ণনায় রমজানকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরে ভাগ করা হয়েছে— রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত। এর মধ্যে প্রথম দশককে বলা হয় রহমতের দশক, যেখানে আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের ওপর দয়ার দুয়ার প্রশস্ত করে দেন। কোরআন ও হাদিসে এই দশকের তাৎপর্য বারবার তুলে ধরা হয়েছে।
রহমতের অর্থ ও কোরআনিক ভিত্তি
‘রহমত’ শব্দটি এসেছে আরবি ‘র-হ-ম’ ধাতু থেকে, যার অর্থ দয়া, করুণা ও অনুগ্রহ। কোরআনের শুরুই হয়েছে এই রহমতের ঘোষণা দিয়ে— “বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম” অর্থাৎ, পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু আল্লাহর নামে।
কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমার রহমত সব কিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে।” (সুরা আল-আ’রাফ: ১৫৬)
রমজানের প্রথম দশক এই আয়াতের বাস্তব প্রতিফলন। এ সময় আল্লাহ তার বান্দাদের ওপর বিশেষভাবে দয়া বর্ষণ করেন, যাতে তারা তাঁর দিকে ফিরে আসতে পারে।
হাদিসে রহমতের ১০ দিন
রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান সম্পর্কে বলেন— “রমজানের প্রথম দশক রহমত, দ্বিতীয় দশক মাগফিরাত এবং শেষ দশক জাহান্নাম থেকে মুক্তির।” (বায়হাকি)
এই হাদিস থেকেই ইসলামী আলেমরা রমজানের প্রথম দশককে রহমতের দশক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ এই সময় আল্লাহ বান্দাদের প্রতি দয়ার আচরণ করেন, তাদের ইবাদত সহজ করে দেন এবং অন্তরে ঈমানের নূর জাগ্রত করেন।
রহমতের দশকে রোজার মর্যাদা
রোজা রমজানের মূল ইবাদত। কোরআনে আল্লাহ বলেন— “হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” (সুরা আল-বাকারা: ১৮৩)
রহমতের দশকে রোজা মানুষকে তাকওয়ার পথে এগিয়ে নেয়। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন— “রোজা আমার জন্য, আর আমি নিজেই তার প্রতিদান দেব।” (বুখারি, মুসলিম)
এই প্রতিদান শুধু পরকালে নয়, দুনিয়াতেও আল্লাহর রহমত ও প্রশান্তির মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
দোয়া: রহমতের প্রধান চাবিকাঠি
রমজানের প্রথম দশকে দোয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। কোরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেন— “আর যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞেস করে, তখন বলে দাও—আমি নিকটবর্তী। আহ্বানকারী যখন আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।” (সুরা আল-বাকারা: ১৮৬)
রহমতের দশকে দোয়ার দরজা বিশেষভাবে খোলা থাকে। রাসুল (সা.) বলেছেন— “রোজাদারের দোয়া ইফতারের সময় কবুল করা হয়।” (ইবনে মাজাহ)
এই দশকে বিনয় ও একাগ্রতার সঙ্গে করা দোয়া বান্দাকে আল্লাহর রহমতের ছায়ায় নিয়ে আসে।
নামাজ ও ইবাদতে মনোনিবেশ
রমজানে ফরজ নামাজের পাশাপাশি নফল নামাজের ফজিলত বহুগুণ বেড়ে যায়। রাসুল (সা.) বলেছেন— “যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানে কিয়াম (তারাবি) করে, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।” (বুখারি)
রহমতের দশক হলো এই কিয়াম ও ইবাদতের অভ্যাস গড়ে তোলার প্রথম ধাপ।
কোরআন নাজিল ও রহমতের সম্পর্ক
রমজান হলো কোরআন নাজিলের মাস। কোরআনে বলা হয়েছে— “রমজান মাস, যাতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হিদায়াত।” (সুরা আল-বাকারা: ১৮৫)
কোরআন নিজেই রহমত। আল্লাহ বলেন— “আমি কোরআন নাজিল করেছি, যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত।” (সুরা বনি ইসরাইল: ৮২)
রহমতের দশকে কোরআন তিলাওয়াত ও তার অর্থ অনুধাবন করলে হৃদয়ে আল্লাহর দয়ার গভীরতা অনুভূত হয়।
দান-সদকা: রহমতের বাস্তব প্রকাশ
রমজানের রহমত শুধু ইবাদতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। রাসুল (সা.) ছিলেন রমজানে সবচেয়ে বেশি দানশীল। হাদিসে এসেছে— “রমজানে রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন প্রবল বেগে প্রবাহিত বাতাসের চেয়েও বেশি দানশীল।” (বুখারি)
দান-সদকা আল্লাহর রহমত টেনে আনে। কোরআনে বলা হয়েছে— “তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, আল্লাহ তার বদলা দেন।” (সুরা সাবা: ৩৯)
পারিবারিক ও সামাজিক রহমত
রহমতের দশক পরিবার ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার সময়। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখাকে ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন— “যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক বৃদ্ধি পাক ও আয়ু দীর্ঘ হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।” (বুখারি)
রমজানের প্রথম দশক এই সম্পর্কগুলো নতুন করে জাগ্রত করার সুযোগ এনে দেয়।
আত্মশুদ্ধি ও তাওবার সুযোগ
রহমতের দশক মানুষকে তাওবার পথে আহ্বান করে। কোরআনে আল্লাহ বলেন— “হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।” (সুরা যুমার: ৫৩)
এই আয়াত রহমতের দশকের মূল বার্তা— কেউই আল্লাহর দয়ার বাইরে নয়।
>>> রমজানের প্রথম দশক মুসলমানের জীবনে আল্লাহর রহমত অর্জনের এক স্বর্ণালী সুযোগ। কোরআন ও হাদিসের আলোকে স্পষ্ট— এই সময় ইবাদত, দোয়া, কোরআন তিলাওয়াত ও মানবসেবার মাধ্যমে আল্লাহর দয়া লাভ সহজ হয়। যদি একজন মানুষ এই রহমতের দশককে গুরুত্ব দিয়ে কাটায়, তবে তার পরবর্তী জীবন ও পুরো রমজানই হয়ে উঠতে পারে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছানোর এক ধারাবাহিক পথচলা।
আরটিভি/এমএইচজে