রমজানের ইতিহাস: সভ্যতা ও সংযমের দীর্ঘ যাত্রা

আরটিভি নিউজ

শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ০৭:১০ পিএম


রমজানের ইতিহাস: সভ্যতা ও সংযমের দীর্ঘ যাত্রা
হেরা গুহা। ছবি: সংগৃহীত

রমজান কেবল একটি ধর্মীয় মাস নয় এটি সময়ের স্রোতে গড়ে ওঠা এক পূর্ণাঙ্গ সভ্যতাগত অভিজ্ঞতা। উপবাস, সংযম ও ইবাদতের এই মাস মুসলমানদের ব্যক্তিগত জীবন যেমন নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনি সমাজ, সংস্কৃতি ও ইতিহাসেও রেখে গেছে গভীর ছাপ। ইসলামের জন্মলগ্ন থেকে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা পর্যন্ত রমজান মানুষের বিশ্বাস, আচরণ ও সামাজিক দায়িত্ববোধকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। খবরের কাগজের পাতায় রমজানের ইতিহাস মানে তাই শুধু ধর্মীয় বিবরণ নয়, বরং এক মানবিক অভিযাত্রার দলিল।

বিজ্ঞাপন

ইসলামপূর্ব আরব ও উপবাসের ধারণা

ইসলামের আবির্ভাবের আগে আরব সমাজে রোজা বা উপবাস একেবারে অজানা বিষয় ছিল না। ইহুদি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে নির্দিষ্ট দিনে উপবাস পালনের রীতি প্রচলিত ছিল। আরবের কিছু একেশ্বরবাদী চিন্তাধারায় বিশ্বাসী মানুষ (যাদের হানিফ বলা হতো)নিজেদের মতো করে সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের চর্চা করতেন। ফলে উপবাসের ধারণা সমাজে সম্পূর্ণ নতুন ছিল না, তবে তার কোনো সুসংহত ধর্মীয় কাঠামো তখনো গড়ে ওঠেনি।

বিজ্ঞাপন

এই প্রেক্ষাপটেই ইসলামে রোজার বিধান আসে- যা কেবল খাদ্যবর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নৈতিক ও আত্মিক শুদ্ধতার একটি পূর্ণাঙ্গ অনুশীলনে রূপ নেয়।

কোরআন নাজিল ও রমজানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

বিজ্ঞাপন

রমজানের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় সপ্তম শতকের শুরুতে। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, এই মাসেই মানবজাতির জন্য পথনির্দেশনা হিসেবে পবিত্র কোরআন নাজিল হয়। ৬১০ খ্রিস্টাব্দে, মক্কার উপকণ্ঠে অবস্থিত হেরা গুহা-তে ধ্যানরত অবস্থায় নবী মুহাম্মদ (সা.) প্রথম ওহি লাভ করেন। এই ঘটনাই ইসলামের সূচনা এবং একই সঙ্গে রমজানকে ইতিহাসের এক অনন্য মাসে পরিণত করে।

কোরআনের ভাষায়, রমজান হলো সেই মাস- যে মাসে কোরআন নাজিল হয়েছে মানুষের জন্য পথপ্রদর্শক ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে। ফলে রোজা শুধু শারীরিক উপবাস নয়, কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি সময়।

বিজ্ঞাপন

রোজা ফরজ হওয়ার প্রেক্ষাপট

ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে রোজা বর্তমান কাঠামোয় ফরজ ছিল না। হিজরতের পর দ্বিতীয় হিজরি সনে (৬২৪ খ্রিস্টাব্দে) রমজানের রোজা মুসলমানদের ওপর ফরজ করা হয়। তখন ইসলামী সমাজের কেন্দ্র ছিল মদিনা। একটি নতুন রাষ্ট্র, নতুন সামাজিক শৃঙ্খলা ও নৈতিক কাঠামো গড়ে উঠছিল।

এই সময়ে রোজার বিধান মানুষের আত্মসংযমের পাশাপাশি সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রথমদিকে রোজার নিয়ম ছিল কঠোর- ইফতারের পর ঘুমিয়ে পড়লে আর খাবার গ্রহণ করা যেত না। পরে আল্লাহর পক্ষ থেকে সহজীকরণ আসে, যা ইসলামের মানবিক ও বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গিকে স্পষ্ট করে।

বদর যুদ্ধ: রোজা ও সংগ্রামের মিলন

রমজানের ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো বদর যুদ্ধ। দ্বিতীয় হিজরি সনের ১৭ রমজান সংঘটিত এই যুদ্ধে সংখ্যায় কম হলেও মুসলমানরা শক্তিশালী বাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করেন। রোজা অবস্থায় সংঘটিত এই যুদ্ধ মুসলিম সমাজে রমজানকে ত্যাগ, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার প্রতীকে রূপ দেয়।

এই ঘটনা প্রমাণ করে, রমজান কেবল নীরব সাধনার মাস নয়; প্রয়োজনে ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার শক্তিও এই মাস থেকেই আসে।

খেলাফত যুগে রমজান

উমাইয়া ও আব্বাসীয় খেলাফত আমলে রমজান রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। শাসকরা এই মাসে দানশীলতা বাড়াতেন, দরিদ্রদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা জোরদার করা হতো। অনেক ক্ষেত্রে কারাবন্দিদের শাস্তি লঘু করা কিংবা বিশেষ সুযোগ দেওয়ার নজিরও ইতিহাসে পাওয়া যায়।

এই সময়েই মসজিদকেন্দ্রিক রমজান সংস্কৃতি বিস্তৃত হয়। তারাবির নামাজ, কোরআন খতম ও রাতব্যাপী ইবাদত মুসলিম নগরজীবনের চিত্র বদলে দেয়। বিশেষ করে মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববী-তে রমজান ধীরে ধীরে এক বিশাল ধর্মীয় সমাবেশে রূপ নেয়।

লাইলাতুল কদর: হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ রাত

রমজানের শেষ দশকের ইসলামী ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন একটি বিজোড় রাত লাইলাতুল কদর। বিশ্বাস করা হয়, এই রাতেই কোরআনের প্রথম অংশ নাজিল হয়। কোরআনের ভাষায়, এই রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।

ইতিহাসে দেখা যায়, আলেম, সুফি ও ধর্মীয় মনীষীরা এই রাতকে কেন্দ্র করে আত্মশুদ্ধির বিশেষ সাধনা করেছেন। তাসাউফ বা সুফিবাদের বিকাশেও এই রাতের ভাবধারা গভীর প্রভাব ফেলেছে।

রমজান ও সমাজসংস্কৃতি

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রমজান একটি সমৃদ্ধ সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। মধ্যপ্রাচ্যে রমজান মানেই পারিবারিক সমাবেশ, ঐতিহ্যবাহী খাবার ও মসজিদকেন্দ্রিক জীবন। দক্ষিণ এশিয়ায় সেহরি ও ইফতার ঘিরে গড়ে উঠেছে নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি।

অটোমান আমলে সেহরি জাগানোর জন্য ঢোল বা ড্রাম বাজানোর প্রথা চালু হয়, যা আজও তুরস্কের কিছু অঞ্চলে দেখা যায়। এভাবে রমজান ধর্মীয় চর্চার পাশাপাশি লোকজ সংস্কৃতিরও বাহক হয়ে ওঠে।

দানশীলতা ও মানবিকতা

রমজান মানেই দান। জাকাত ও সদকাহ আদায়ের ক্ষেত্রে এই মাসকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ইতিহাসে বহু দাতব্য প্রতিষ্ঠান, মুসাফিরখানা ও ফ্রি খাবার বিতরণ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে রমজানকে কেন্দ্র করে। এই দানশীলতা মুসলিম সমাজে একটি কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে।

ঔপনিবেশিক যুগে রমজান

ঔপনিবেশিক শাসনামলে রমজান হয়ে ওঠে মুসলিম পরিচয় ও আত্মমর্যাদা রক্ষার প্রতীক। রাজনৈতিক দমন-পীড়নের মধ্যেও রমজানের সমবেত ইবাদত ও সামাজিক আয়োজন মুসলমানদের ঐক্য ধরে রাখতে ভূমিকা রাখে। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, রমজান তখন নীরব সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ভাষায় রূপ নেয়।

আধুনিক বিশ্বে রমজান

আজকের বিশ্বে রমজান একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। প্রযুক্তি ও নগরজীবনের ব্যস্ততার মাঝেও এই মাস মানুষকে থামতে শেখায়। টেলিভিশন, রেডিও ও ডিজিটাল মাধ্যমে কোরআন তিলাওয়াত ও তারাবির সরাসরি সম্প্রচার রমজানকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।

আরও পড়ুন

একই সঙ্গে যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও উদ্বাস্তু সংকটে থাকা মানুষের কাছে রমজান আজও আশার প্রতীক- সংযমের মধ্যেই মানবিক মর্যাদা রক্ষার বার্তা।

>>> রমজানের ইতিহাস আসলে মানুষের ইতিহাস- আত্মসংযম, নৈতিকতা ও সহমর্মিতার ইতিহাস। হেরা গুহার নিভৃত অন্ধকার থেকে আধুনিক শহরের আলোকোজ্জ্বল ইফতার টেবিল পর্যন্ত রমজান বহন করে চলেছে এক অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা। সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, কিন্তু রমজানের মূল শিক্ষা 'মানুষ হয়ে ওঠা' আজও অপরিবর্তিত।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission