মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ০৯:২৫ পিএম
রমজানুল মুবারক রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মহিমান্বিত মাস। এ মাসে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বান্দাদের জন্য ক্ষমা ও নাজাতের দরজা উন্মুক্ত করে দেন। শয়তান শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকে, জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ রাখা হয়।
কিন্তু আফসোস! অনেকে রোজা রাখেন, সালাত আদায় করেন, তারাবি পড়েন; অথচ কিছু “ক্ষুদ্র” মনে করা গুনাহের কারণে রমজানের প্রকৃত বরকত ও সওয়াব থেকে বঞ্চিত হন।
মনে রাখতে হবে— গুনাহ ছোট নয়, যার নাফরমানি করা হয় তিনি মহান আল্লাহ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন: “ছোট গুনাহ থেকে সাবধান থাকো; কারণ ছোট গুনাহ জমতে জমতে পাহাড়সম হয়ে যায়।” (মুসনাদ আহমাদ)
রমজানে নেক আমলের সওয়াব যেমন বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, তেমনি গুনাহের ক্ষতিও মারাত্মক হয়। তাই এ মাসে বিশেষভাবে নিম্নোক্ত ক্ষুদ্র গুনাহগুলো থেকে বেঁচে থাকা জরুরি।
১. মিথ্যা কথা বলা
রোজা রেখে মিথ্যা বলা অত্যন্ত ভয়ংকর গুনাহ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে না, আল্লাহর কাছে তার পানাহার ত্যাগের কোনো মূল্য নেই।” (সহিহ বুখারি)
রোজা শুধু ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করার নাম নয়; বরং সত্যবাদিতা ও তাকওয়ার শিক্ষা।
২. গিবত (পরনিন্দা) করা
কারো অনুপস্থিতিতে তার দোষ আলোচনা করা গিবত। “আমি তো সত্য বলেছি”—এই অজুহাত গিবতকে বৈধ করে না।
গিবত নেক আমলকে আগুনের মতো পুড়িয়ে দেয়।
৩. অহেতুক ও অশালীন কথা বলা
অপ্রয়োজনীয় আড্ডা, হাসি-তামাশা, কটূক্তি— এসব জিহ্বার গুনাহ। রোজা মানুষকে সংযম ও কম কথা বলার শিক্ষা দেয়।
৪. কাউকে কষ্ট দেওয়া
রূঢ় আচরণ, অপমান, কটুকথা— এসব ছোট মনে হলেও বড় গুনাহ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: “প্রকৃত মুসলমান সে, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ।”
৫. রাগ নিয়ন্ত্রণ না করা
রোজা ধৈর্যের প্রশিক্ষণ। কেউ উত্তেজিত করলে বলা উচিত: “ইন্নি সা-ইম”— আমি রোজাদার।
৬. চোখের গুনাহ
হারাম দৃশ্য দেখা, অশালীন ছবি-ভিডিও দেখা— এগুলো রোজার নূর নষ্ট করে দেয়। রোজা শুধু পেটের নয়, চোখেরও।
৭. কানের গুনাহ
গিবত শোনা, গুজব শোনা, অশ্লীল গান শোনা— এসব থেকেও বিরত থাকতে হবে। যা বলা হারাম, তা শোনাও হারাম।
৮. অহংকার
ইবাদত করে অন্যকে তুচ্ছ ভাবা মারাত্মক গুনাহ। অহংকার ইবাদতের সওয়াব নষ্ট করে দেয়।
৯. লোক দেখানো ইবাদত (রিয়া)
ইবাদত শুধু আল্লাহর জন্য। লোক দেখানো আমলকে ইসলাম “রিয়া” বলে— যা গোপন শিরকের মতো ভয়ংকর।
১০. ইফতারে অপচয়
অতিরিক্ত খাবার তৈরি করে নষ্ট করা অপচয়। কুরআনে অপচয়কারীদের শয়তানের ভাই বলা হয়েছে।
১১. সময় নষ্ট করা
অকারণে মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া, সিরিজ, গেমে সময় নষ্ট করা রমজানের রুহের পরিপন্থি। রমজান সময়ের কদর শেখায়।
১২. সালাতে অলসতা
রোজা রেখে সালাতে গাফিলতি মারাত্মক ভুল। সালাত ছাড়া রোজা পূর্ণতা পায় না।
১৩. দোয়া থেকে গাফিলতি
ইফতারের পূর্ব মুহূর্ত দোয়া কবুলের সময়। এ সুযোগ হাতছাড়া করা বড় বঞ্চনা।
১৪. তওবায় বিলম্ব করা
“পরে তওবা করব”— এ চিন্তা শয়তানের ধোঁকা। রমজানই তওবার সেরা সময়।
১৫. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন রাখা
রাগ-অভিমানের কারণে সম্পর্ক নষ্ট রাখা গুনাহ। রমজান মিলন ও ক্ষমার মাস।
১৬. গরিব-দুঃখীকে অবহেলা করা
নিজে ইফতার করি, পাশের ক্ষুধার্তের খবর না নেওয়া রমজানের আদর্শ নয়। দান-সদকা গুনাহ মোচনের মাধ্যম।
১৭. যাকাত ও ফিতরায় গাফিলতি
যাকাত গরিবের হক। হক নষ্ট করা আল্লাহর কাছে কঠিন জবাবদিহির বিষয়।
১৮. সন্দেহজনক কাজ
যে কাজ হালাল-হারামের মাঝামাঝি— তা পরিহার করাই তাকওয়ার পরিচয়।
১৯. অন্তরের হিংসা
অন্যের সুখ দেখে কষ্ট পাওয়া অন্তরের রোগ। হিংসা নেক আমল ধ্বংস করে।
২০. রমজানকে হালকাভাবে নেওয়া
“প্রতিবছরই তো আসে”— এই ভাব সবচেয়ে বড় অবহেলা। হয়ত এটাই আমাদের জীবনের শেষ রমজান।
>>> রমজান শুধু উপবাসের মাস নয়; আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের মাস। ক্ষুদ্র গুনাহকে অবহেলা না করে যদি আমরা জিহ্বা, চোখ, কান, অন্তর ও আমলকে পবিত্র রাখতে পারি— তবে রোজা হবে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সোপান।
আসুন, এ রমজানে বড় গুনাহ তো বটেই, ক্ষুদ্র গুনাহ থেকেও নিজেদের হেফাজত করি।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদেরকে রমজানের পূর্ণ বরকত, রহমত ও মাগফিরাত নসিব করুন।
আরটিভি/এমএইচজে