বুধবার, ২৭ মে ২০২৬ , ০৯:৪৮ পিএম
ঈদুল আজহার দিনটি অত্যন্ত গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এই দিনে সবচেয়ে বড় ইবাদত হল কোরবানি করা। ইসলাম আনন্দ-উৎসবের এ দিনকে ইবাদত-বন্দেগি দ্বারা মাহাত্ম্যপূর্ণ করেছে। এ দিনের রয়েছে করণীয় ও বর্জনীয়।
তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির চর্চা
ঈদের বাহ্যিক আনন্দের পাশাপাশি অন্তরকে পরিশুদ্ধ করাও জরুরি। হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার ও গুনাহ থেকে দূরে থেকে আল্লাহর ভয় অন্তরে জাগ্রত করতে হবে। কুরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্যই হলো অন্তরের পশুত্বকে জবাই করা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَلَا إِلَى أَمْوَالِكُمْ وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ
‘আল্লাহ তোমাদের চেহারা ও সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান।’ (সহীহ মুসলিম)
সুন্নাহ অনুযায়ী ঈদের আমল পালন
ঈদের দিন সুন্নাহ মোতাবেক গোসল করা, উত্তম পোশাক পরিধান করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা এবং ঈদগাহে গিয়ে ঈদের সালাত আদায় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাকবীরে তাশরীক হলো— الله أكبر الله أكبر لا إله إلا الله والله أكبر الله أكبر ولله الحمد
৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরয সালাতের পর ১বার করে তা পাঠ করা ওয়াজিব।
সামর্থ্যবানদের কুরবানি আদায় করা
যাদের উপর কুরবানি ওয়াজিব, তাদের অবশ্যই এ ইবাদত আদায় করতে হবে। এটি নিছক সামাজিক রীতি নয়; বরং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন— مَنْ وَجَدَ سَعَةً فَلَمْ يُضَحِّ فَلَا يَقْرَبَنَّ مُصَلَّانَا
‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটেও না আসে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ)
কুরবানির পশু হালাল, সুস্থ ও ত্রুটিমুক্ত হওয়া জরুরি। পাশাপাশি পশুর প্রতি দয়া ও কোমল আচরণ করাও ইসলামের শিক্ষা।
গরিব-দুঃখীর পাশে দাঁড়ানো
ঈদের আনন্দ কেবল নিজের পরিবারে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের অসহায় মানুষদের মাঝেও ছড়িয়ে দিতে হবে। কুরবানির গোশত আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করা উত্তম।
বর্তমান সমাজে এমন বহু মানুষ আছেন, যারা বছরজুড়ে ভালো খাবার পান না। তাদের মুখে হাসি ফোটানোই ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য।
পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ রক্ষা
কুরবানির পর রক্ত, বর্জ্য ও আবর্জনা যথাযথভাবে পরিষ্কার করা সামাজিক ও ইসলামী দায়িত্ব। অপরিচ্ছন্নতা মানুষের কষ্টের কারণ হয় এবং পরিবেশ দূষণ সৃষ্টি করে। ইসলাম পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
আত্মীয়তার সম্পর্ক সুদৃঢ় করা
ঈদ হলো সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুবর্ণ সুযোগ। অভিমান, বিরোধ ও দূরত্ব ভুলে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও বন্ধুদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعُ رَحِمٍ
‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহীহ বুখারী)
শালীনভাবে ঈদ উৎসব পালন করা
ঈদের খুশী উদযাপন করতে গিয়ে যেন শরীয়ত লঙ্ঘন না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। অনেকে পিকআপ ভ্যানে করে বক্সে গান বাজিয়ে আনন্দ করে থাকে, ফটকা ফুটিয়ে শব্দ দূষণ করেও অনেকে আনন্দ করে থাকে। আনন্দ যেনো অন্যের সমস্যার কারণ না হয় সে দিকে লক্ষ রাখতে হবে।
কেননা রাসুল সা: বলেছেন- المُسلِمُ مَن سَلِمَ المُسلِمونَ مِن لِسانِه ويَدِه؛
প্রকৃত মুসলিম হচ্ছে সে ব্যক্তি যার হাত ও মুখ থেকে অপর মুসলিম নিরাপদ থাকে। (সহীহ বুখারী)
অপচয় ও প্রতিযোগিতা পরিহার করা
বর্তমানে ঈদকে কেন্দ্র করে অনেকেই অপ্রয়োজনীয় জাঁকজমক, অহংকার ও অপচয়ে লিপ্ত হন। অথচ ইসলাম অপচয়কে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ
‘নিশ্চয় অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।’
(সূরা আল-ইসরা: ২৭)
সুতরাং কুরবানিতে লোক দেখানো নয়; বরং একনিষ্ঠতা ও আল্লাহভীতি থাকা আবশ্যক।
ঈদের দিনে রোজা
ঈদের দিনে রোজা রাখা হারাম। ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। (সহীহ বুখারি ও মুসলিম)
ঈদের দিনকে কবর যিয়ারতের জন্য নির্দিষ্ট করা
ঈদের দিন কবর যিয়ারতের বিশেষ দিন মনে করে যিয়ারত করা বিদআত (সহীহ্ ফিকহুস সুন্নাহ- ১/৬৬৯) তবে পূর্ব নির্ধারিত রুটিন ছাড়া হঠাৎ সুযোগ হয়ে গেলে একাকী কেউ যিয়ারত করলে দোষনীয় নয়।
ঈদের সালাত আদায় না করে কেবল আনন্দ ফুর্তি করা
অনেকে ঈদের আনন্দে মশগুল হয়ে নতুন জামা-কাপড় পরিধান, সেমাই, ফিরনী ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, ঈদের সালাত আদায় করার কথা ভুলে যায়। অথচ এই দিনে ঈদের সালাত ও কোরবানি করাই হচ্ছে মুসলমানদের মূল কাজ।
মুসাফাহা মুআনাকা এই দিনে করতে হবেই এটা মনে করা
ঈদগাহে বা ঈদের দিন সাক্ষাত হলে মুসাফাহা ও মুআনাকা করতেই হবে এমন বিশ্বাস ও আমল করা বিদআত। তবে এমন বিশ্বাস না করে সালাম ও মুসাফাহার পর মু‘য়ানাকা (গলায় গলা মিলানো) করায় কোন অসুবিধা নেই। কারণ মুসাফাহা ও মুআনাকা করার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি হয়।
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, ‘একদা হাসান ইবনে আলী রা. নবী কারীম (সা.) এর নিকট আসলেন, তিনি তখন তাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং মুআনাকা (কোলাকুলি) করলেন।’
যে সব পশু কোরবানি করা জায়েয নয়
হযরত বারা ইবনে আযেব রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার রাসূলূল্লাহ (সা.)- কে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, কোরবানির ব্যাপারে কোন ধরনের জন্তু হতে বেঁচে থাকতে হবে?
রাসূল (সা.) হাতের দ্বারা (অর্থাৎ চার আঙ্গুল দেখিয়ে) বললেন, চার রকমের পশু হতে-
১. খোঁড়া- যার খোঁড়ামি স্পষ্ট,
২. কানা- যার অন্ধত্ব স্পষ্ট,
৩. রোগা- যার রোগ স্পষ্ট এবং
৪. দুর্বল- যার হাড়ে মজ্জা নেই। (মালেক, আহমদ, তিরমিযী, আবূ দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ ও দারেমী)
ঈদুল আজহা আমাদের শেখায়; আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় বস্তুকেও ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকতে হবে। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ জীবনে তাকওয়া, ত্যাগ, সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই ঈদুল আজহার প্রকৃত শিক্ষা বাস্তবায়িত হবে।
আমরা ঈদুল আজহাকে কেবল আনুষ্ঠানিক উৎসব হিসেবে নয়; বরং আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক মহাসুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি।
লেখক: প্রিন্সিপাল, মাদ্রাসাতুল হিদায়া, ফেনী।
আরটিভি/এমএম