মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬ , ০৯:১১ পিএম
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার ধর্ম। যেখানে মুমিনদের ইমান ও ইবাদতের পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতার ওপরও সমান গুরুত্বরোপ করা হয়েছে।
একজন মুসলমানের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পরিচ্ছন্নতা তার ইমানের সৌন্দর্য প্রকাশ করে। মুখ ও দাঁতের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সেই পবিত্রতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর এ কারণেই বিশ্বনবী রাসুলুল্লাহ (সা.) মিসওয়াক ব্যবহারে এত বেশি উৎসাহ দিয়েছেন যে, উম্মতের ওপর কষ্টের আশঙ্কা না থাকলে তিনি প্রত্যেক নামাজের আগে এটি বাধ্যতামূলক করে দিতেন। মিসওয়াক কেবল দাঁত পরিষ্কারের একটি উপকরণ নয়; এটি সুন্নাহ, ইবাদতের প্রস্তুতি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল।
মিসওয়াক: পরিচ্ছন্নতা ও সুন্নাহর এক অনন্য প্রতীক
ইসলামে পবিত্রতা ঈমানের অপরিহার্য অংশ। আল্লাহ তাআলা পবিত্রতা অর্জনকারীদের প্রতি তার ভালোবাসার কথা কুরআনে ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্রতা অর্জন করে তাদেরও ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২২২)
মুখের পরিচ্ছন্নতা এই পবিত্রতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত মিসওয়াক করতেন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও এ আমলের প্রতি উৎসাহিত করতেন।
প্রত্যেক নামাজের আগে মিসওয়াক করার প্রতি উৎসাহ
মিসওয়াকের গুরুত্ব বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَوْلَا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي لَأَمَرْتُهُمْ بِالسِّوَاكِ عِنْدَ كُلِّ صَلَاةٍ
‘যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর না হতো, তবে আমি প্রত্যেক নামাজের সময় তাদের মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।’ (বুখারি ৮৮৭, মুসলিম ২৫২)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, মিসওয়াক শুধু পরিচ্ছন্নতার জন্য নয়; এটি ইবাদতের প্রস্তুতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ।
রাতের তাহাজ্জুদের আগে ছিল মিসওয়াক
রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতে ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায়ের আগে সর্বপ্রথম মিসওয়াক করতেন। হজরত হুজাইফা (রা.) বলেন—
كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا قَامَ مِنَ اللَّيْلِ يَشُوصُ فَاهُ بِالسِّوَاكِ
‘রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতে ঘুম থেকে উঠলে মিসওয়াক দিয়ে তার মুখ পরিষ্কার করতেন।’ (বুখারি ২৪৫, মুসলিম ২৫৫)
ঘরে প্রবেশের সময়ও ছিল মিসওয়াক
হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন ঘরে প্রবেশ করতেন, তখন প্রথমেই মিসওয়াক ব্যবহার করতেন।
كَانَ أَوَّلَ مَا يَبْدَأُ بِهِ السِّوَاكُ
‘ঘরে প্রবেশের পর তিনি সর্বপ্রথম মিসওয়াক করতেন।’ (মুসলিম ২৫৩)
শুধু দাঁত নয়, জিহ্বাও পরিষ্কার করতেন
মিসওয়াক ব্যবহারে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুখের সম্পূর্ণ পরিচ্ছন্নতার প্রতি গুরুত্ব দিতেন। হজরত আবু মুসা আল-আশআরি (রা.) বলেন—
‘আমি নবী (সা.)-এর কাছে এসে দেখলাম, তার হাতে মিসওয়াক। তিনি মিসওয়াকটি মুখের ভেতর এমনভাবে ব্যবহার করছিলেন যে ‘উহ, উহ’ শব্দ হচ্ছিল।’ (বুখারি ২৪৪)
এ থেকে বোঝা যায়, শুধু দাঁত নয়; মুখগহ্বর ও জিহ্বার পরিচ্ছন্নতার প্রতিও তিনি বিশেষ যত্নবান ছিলেন।
মিসওয়াক নবীদের সুন্নাহ
রাসুলুল্লাহ (সা.) মিসওয়াককে পূর্ববর্তী নবীদের সুন্নাহর অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
أَرْبَعٌ مِنْ سُنَنِ الْمُرْسَلِينَ: الْحَيَاءُ، وَالتَّعَطُّرُ، وَالسِّوَاكُ، وَالنِّكَاحُ
‘চারটি বিষয় নবীদের সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত— লজ্জাশীলতা, সুগন্ধি ব্যবহার, মিসওয়াক এবং বিবাহ।’ (তিরমিজি ১০৮০)
আধুনিক যুগে মিসওয়াকের গুরুত্ব
আজকের যুগে দাঁত পরিষ্কারের জন্য টুথব্রাশ ও টুথপেস্ট ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ইসলাম এগুলো ব্যবহারে কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। বরং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাই ইসলামের মূল শিক্ষা। তবে মিসওয়াকের মর্যাদা এর সুন্নাহ হওয়ায়। তাই অনেক আলেম বলেন, ব্রাশ ব্যবহার করলেও সুযোগ থাকলে মিসওয়াকের সুন্নাহ জীবিত রাখা উত্তম।
মিসওয়াক আমাদের শেখায়—
• মুখ ও দাঁতের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা।
• ইবাদতের আগে নিজেকে প্রস্তুত করা।
• সুন্নাহর প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করা।
• দৈনন্দিন জীবনে পরিচ্ছন্নতাকে অভ্যাসে পরিণত করা।
মিসওয়াক একটি ছোট আমল হলেও এর গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। এটি যেমন মুখের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করে, তেমনি একজন মুসলমানকে সুন্নাহর অনুসারী হওয়ার সুযোগ এনে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবনের বিভিন্ন সময়ে— নামাজের আগে, ঘুম থেকে ওঠার পর, এমনকি ঘরে প্রবেশের সময়ও মিসওয়াক ব্যবহার করতেন। তার এই ধারাবাহিক আমল আমাদের শেখায় যে, ইসলামে ছোট কোনো সুন্নাহকেও অবহেলা করার সুযোগ নেই। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত মিসওয়াক ব্যবহার করা, অথবা অন্তত মুখ ও দাঁতের পরিচ্ছন্নতার প্রতি যত্নবান হওয়া একজন মুমিনের উত্তম চরিত্র ও সুন্নাহপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ।
আরটিভি/ এসকেডি