images

বিজ্ঞান

মদ্যপান না করেও মাতাল হওয়ার কারণ খুঁজে পেলেন গবেষকেরা

শনিবার, ১০ জানুয়ারি ২০২৬ , ০৭:৩৮ পিএম

কল্পনা করুন এমন এক ব্যক্তির কথা, যিনি গত এক দশকে মদের দোকানেও পা রাখেননি। অথচ এক বাটি ভাত কিংবা আলুর চপ খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তার কথা জড়িয়ে আসছে, চোখ লাল হয়ে যাচ্ছে এবং হাঁটাচলায় ভারসাম্য হারাচ্ছেন। চারপাশের মানুষ ভাবছে তিনি মদ্যপ, অথচ তিনি জানেন ই না তার রক্তে মিশে যাওয়া এই বিষের উৎস কোনো মদের বোতল নয়, বরং তার নিজের অন্ত্রেই তৈরি করছে! চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘অটো-ব্রুয়ারি সিনড্রোম’ নামক এই অদ্ভুত রোগটি যেন কোনো রহস্যজনক স্থান থেকে উঠে আসা এক বাস্তবতা হয়ে দাড়িয়েছিল চিকিৎসকদের কাছে। 

উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে চিকিৎসকরা এমন রোগীর বর্ণনা দিলেও দীর্ঘকাল ধরে এর জন্য দায়ী করা হতো অন্ত্রের অতিরিক্ত ছত্রাক বা ফাঙ্গাসকে। ধারণা ছিল, ছত্রাক শর্করাকে গেঁজিয়ে মদ তৈরি করে। কিন্তু সম্প্রতি ‘নেচার মাইক্রোবায়োলজি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় গবেষণাটি এক ভিন্ন সত্য উন্মোচন করেছে। গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন যে, এই রোগের মূল হোতা আসলে ব্যাকটেরিয়া, বিশেষ করে উচ্চমাত্রায় অ্যালকোহল তৈরি করতে সক্ষম ‘ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া’ এবং ‘এশেরিকিয়া কোলাই’। 

আরও পড়ুন
844851851

টয়লেট ট্যাবলেটেই মিলবে কিডনি রোগের আগাম সতর্কবার্তা

বেইজিংয়ের ক্যাপিটাল ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক্সের মাইক্রোবায়োলজিস্ট জিং ইউয়ান জানান, নতুন এই গবেষণাটি কয়েক দশকের পুরনো ‘ছত্রাক তত্ত্ব’ বাতিল করার জন্য যথেষ্ট প্রমাণ হাজির করেছে। গবেষকদের মতে, এটি মূলত ব্যাকটেরিয়াজনিত ইথানল ফারমেন্টেশনের ফলাফল।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট বের্ন্ড শ্নাবল বলেন, এই রোগটি পরিবারগুলোর জন্য এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। এমনকি ডাক্তাররাও বিশ্বাস করেন না যখন রোগীরা বলেন যে তারা মদ্যপান করেননি। অনেক ক্ষেত্রে দিনের বেলা মাতাল থাকার অপবাদে রোগীরা চাকরি হারান। একজন তরুণীর কথা জানা যায়, যিনি সাধারণ গ্লুকোজ খাওয়ার পরই মাতাল হয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্তের মতো পড়ে গিয়েছিলেন। চিকিৎসকরা যখন কড়া নজরদারিতে পরীক্ষা করেন, তখন দেখা যায় মদ্যপান ছাড়াই তাদের রক্তে অ্যালকোহলের মাত্রা বিপদসীমা ছাড়িয়ে গেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, সুস্থ মানুষের অন্ত্রে যে সামান্য অ্যালকোহল তৈরি হয় তা দেহ শোষণ করে নেয়। কিন্তু এই সিনড্রোমে আক্রান্তদের পেটে ব্যাকটেরিয়ার এমন এক ‘ককটেল’ তৈরি হয় যা লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করে, এমনকি লিভার সিরোসিস পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে। অদ্ভুত বিষয় হলো, আক্রান্তদের অন্ত্রে পাওয়া এই ব্যাকটেরিয়াগুলো কেবল মদই তৈরি করে না, বরং লিভারের অন্যান্য বিপাকীয় সমস্যার জন্যও দায়ী।

বর্তমানে এই রোগে আক্রান্তদের অ্যান্টিফাঙ্গাল ও অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের পাশাপাশি চিনি ও শর্করা জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো অন্ত্রের অ্যালকোহল উৎপাদনকারী অণুজীবগুলোর খাদ্যের জোগান বন্ধ করা। তবে নতুন এই আবিষ্কারের ফলে এখন অন্ত্রের অণুজীবের বিপাক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এনে আরও কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবন করা সম্ভব হবে। বছরের পর বছর ধরে হঠাৎ মাতাল হওয়ার আতঙ্কে থাকা রোগীদের জন্য বিজ্ঞানের এই নতুন মোড় এক বড় স্বস্তি হয়ে উঠতে পারে।

আরটিভি/এআর