মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬ , ১০:১৩ পিএম
কওমি মাদরাসার শিক্ষা পরিবেশ, শৃঙ্খলা ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা জোরদারে ৬ দফা সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছেন আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে তিনি দেশের শীর্ষ আলেম ও মাদরাসার দায়িত্বশীলদের প্রতি এই উদাত্ত আহ্বান জানান।
পোস্টে শায়খ আহমাদুল্লাহ উল্লেখ করেন, কওমি মাদরাসা দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং রাষ্ট্রীয় অনুদান ছাড়াই লাখ লাখ এতিম ও দুস্থ শিশুর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন করছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের প্রতি শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা এই প্রতিষ্ঠানের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের ওপর ছায়া ফেলছে। ইসলামে শিশুদের সঙ্গে কোমল আচরণের কড়া নির্দেশনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, কিছু তথাকথিত শিক্ষকের নৈতিকতাবিরোধী কর্মকাণ্ড অত্যন্ত লজ্জাজনক। সংবাদমাধ্যমের অতিরঞ্জন বা ষড়যন্ত্রের অজুহাতে বিদ্যমান বাস্তব সমস্যাগুলোকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই বলেও তিনি সতর্ক করেন।
মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার সুরক্ষায় শায়খ আহমাদুল্লাহ যে ৬টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেছেন তা হলো:
• কেন্দ্রীয় তদন্ত কমিটি গঠন: ‘আল-হাইআতুল উলয়া’র পক্ষ থেকে শীর্ষ আলেম, আইন ও মনস্তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা। কোনো প্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে এই কমিটি নিরপেক্ষ তদন্ত করবে এবং দোষীদের আইনের হাতে সোপর্দ করাসহ একটি ‘সেন্ট্রাল ব্ল্যাকলিস্ট’ বা কেন্দ্রীয় কালোতালিকা তৈরি করবে।
• অভিযোগ গ্রহণ সেল: একটি ডেডিকেটেড হটলাইনের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা করা, যেখানে অভিযোগকারীর পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে এবং তাদের প্রয়োজনীয় মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা প্রদান করা হবে।
• প্রাতিষ্ঠানিক ও অবকাঠামোগত সংস্কার: ক্লাস ও আবাসিক হলগুলোতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে মা-বাবার সান্নিধ্য নিশ্চিত করতে একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত অনাবাসিক শিক্ষা উৎসাহিত করা এবং কওমি মাদরাসার গণরুমের প্রচলিত বিছানা পদ্ধতির পরিবর্তন আনা। এছাড়া শিক্ষকদের দ্বারা শিক্ষার্থীদের দিয়ে ব্যক্তিগত কোনো ধরনের সেবা বা কাজ করানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেন তিনি।
• শিক্ষক ও স্টাফদের কর্মপরিবেশ উন্নয়ন: শিক্ষকদের জন্য কঠোর আচরণবিধিমালা প্রণয়ন এবং শিশু মনস্তত্ত্ব ও সুরক্ষা আইন বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিবাহিত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া এবং শিক্ষকদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য ফ্যামিলি কোয়ার্টার বা নিয়মিত ছুটির ব্যবস্থা করার আহ্বান জানানো হয়।
• নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নীতিমালা: মহিলা মাদরাসাগুলো সম্পূর্ণভাবে নারী কর্মকর্তা ও স্টাফদের দ্বারা পরিচালিত হতে হবে। মূল ফটকের প্রহরী বা দারোয়ান ছাড়া কোনো অবস্থাতেই মাদরাসার ভেতরে পুরুষ শিক্ষক বা স্টাফ রাখা যাবে না।
• অনিয়ন্ত্রিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ: যত্রতত্র গড়ে ওঠা অপরিকল্পিত ও মানহীন প্রাইভেট মাদরাসাগুলোকে নির্দিষ্ট নিয়ম-নীতির আওতায় আনা এবং নতুন প্রতিষ্ঠান খোলার ক্ষেত্রে যথাযথ সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি নিশ্চিত করা।
পোস্টের শেষাংশে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, কওমি মাদরাসা মানুষের আত্মিক আশ্রয়ের শেষ জায়গা। এই পবিত্র অঙ্গনের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রাখতে হলে অন্ধ আত্মপক্ষ সমর্থনের ঊর্ধ্বে উঠে কঠোর আত্মসংশোধনের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। বৃহত্তর স্বার্থে দেশের শীর্ষ আলেমগণ এই প্রস্তাবনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আরটিভি/ এসকেডি