শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬ , ০২:৫৩ পিএম
দীর্ঘ ৩৬ দিন ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন হয় তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের। ছাত্রদের মাধ্যমে ওই আন্দোলন শুরু হলেও শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে অভিনয়শিল্পীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। আন্দোলনে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে প্রাণ হারান বহু সাধারণ মানুষ। আহত ও অঙ্গহানি হয় অনেকের। এদের মধ্যে একজন আন্দোলনকারী ছিলেন তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের সদস্য তামিম ইকবাল। যিনি সক্রিয় ছিলেন আন্দোলনের শুরু থেকে শেখ হাসিনার পতন পর্যন্ত। সে সময় তার ধারণ করা কয়েকটি ভিডিওবার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যা অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে অনেক আন্দোলনকারীদের মধ্যে।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে তামিম ইকবালের কয়েকটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। তার এ সাক্ষাৎকার উঠে এসেছে তৎকালীন সময়ের ভয়াবহ স্মৃতি।
আমরা আজ তামিম ইকবালের স্মৃতি থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ভয়াবহতা উপলব্ধি করার চেষ্টা করব।
আমার লাশটা পরিবারের নিকট পৌঁছে দিয়েন
তামিম ইকবালের ভাষ্যে, ২১ জুলাই কারফিউর দ্বিতীয় দিন- মনে হয়েছিল আজকেই আমার জীবনের শেষদিন। সেদিন রাস্তায় বেশি মানুষ ছিল না, যেন চারদিকে এক নীরব আতঙ্ক বিরাজ করছিল। আমরা ছাত্রদলের নেতৃত্বে ৭০/৮০ জনের একটা টিম ভাটারা, বসুন্ধরা গেইটের দিকে মিছিল নিয়ে অগ্রসর হতে থাকি। হঠাৎ করেই পুলিশ এসে গুলি, টিয়ারগ্যাস ছুড়তে থাকে। টিয়ারগ্যাসের তীব্রতায় টিকটে না পেরে কিছুটা পিছু হটতে হয়। আমাদের সাথের কয়েকজন সহযোদ্ধা, বিভিন্ন গলিতে আশ্রয় নেয়। কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে, টিয়ারগ্যাসে আক্রান্ত হয়ে লুটিয়ে পড়ে! আমি তখন টিয়ারগ্যাসে আক্রান্ত হয়ে একটি গলিতে আশ্রয় নিই। আমার অবস্থান ছিল যমুনা ফিউচার পার্কের পকেট গেটের অপর পাশে। তবে নিরস্ত্র হলেও মনোবল হারাইনি। কিছুক্ষণ পরে এসে রাস্তায় জড়ো হওয়া মাত্রই আমাদের উদ্দেশ্য করে অনবরত গুলি করতে থাকে যা আশেপাশের দোকানের শাটার এবং ওয়ালে লাগে।
মোহ মোহ গুলির তীব্রতা ও ভয়াবহতা মুহূর্তেই ধ্বংস যজ্ঞে রুপ নেয়। তখন আমার মনে হয়েছিল আজকেই আমার জীবনের শেষদিন, তখন অনেকটা আতঙ্কিত হয়ে আমার পকেট থেকে মোবাইল বের করে একটি ভিডিও রেকর্ড করি। বলি যে- 'এ-ই আন্দোলনে যদি আমার মৃত্যু হয়, আমার লাশটা আমার পরিবারের নিকট পৌঁছে দিয়েন'।
তামিম ইকবাল বলেন, ৩ জুলাই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের, ভিডিওবার্তায় দেওয়া নির্দেশনায় বসুন্ধরা গেইট অভিমুখে ছাত্রদলের নেতৃত্বে অংশ নিয়েছিলাম। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম রবিনের নেতৃত্বে ভাটারা, বসুন্ধরায় সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তুলি। আন্দোলনের সময় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা একটি বাসা ছিল রাত্রিযাপনের নিরাপদ জায়গা। প্রতিদিন সকাল ১০টার মধ্যে কয়েকজন কয়েকজন করে প্রগতি স্বরণীর মহাসড়কটি অবরোধ করে অবস্থান নিতাম- সন্ধ্যা হওয়ার আগেই, আমরা রাজপথ ছেড়ে দিতাম।
তিনি বলেন, ঐদিনগুলো সহজ ছিল না। নির্মম গণহত্যা ও আন্দোলনের নগরীতে পরিণত হয়েছিল বসুন্ধরা গেইট অভিমুখ। আমাদের সাথে আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকেই আমাদের মাঝে নেই- তারা পুলিশের গুলিতে শহিদ হয়েছেন। স্কুল জীবন থেকেই ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়ি। তৎকালীন স্বৈরশাসক খুনি হাসিনাকে হঠানোই ছিল আমার একমাত্র স্বপ্ন।
হয় বাঁচব নয় মরব, খুনি হাসিনার পতন করবই করব
স্মৃতিচারণ করে তামিম ইকবাল বলেন, আন্দোলন যখন তুঙ্গে ১৬ জুলাই আবু সাইদ এবং ওয়াসিম আকরাম শহিদ হওয়ার পর আমি নিজেও মৃত্যুর ভয় হারিয়ে ফেলি। মনস্থির করি হয় বাঁচব নয় মরব এ-ই খুনি হাসিনার পতন করবই করব। যে সময়টাতে লন্ডন থেকে সাবেক ছাত্রদল নেতা ইঞ্জি. সফিকুল ইসলাম রিবলু ফোন করে দিকনির্দেশনা দেন যেন আন্দোলনের মাঠ কোনোভাবেই না ছাড়ি এবং সব ধরনের সহযোগিতা করেন। রিবলু ভাই ২০১৪ সালের হাসিনা পতনের আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে বাম চোখটি হারান উনি বলেন- হাসিনাকে হটানোর এটাই তোমাদের মোক্ষম সুযোগ। এছাড়া অতীত আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে বিভিন্ন পরামর্শ দেন। উনি বলেন- রাজপথ ছেড়ে দিলে তোমাদের সব সহযোদ্ধাদের জীবন দিতে হবে। তোমাদের সফল হতেই হবে।
উনি সে সময় আন্দোলনকারীদের জন্য পানি, খাবার, আহতদের চিকিৎসার জন্য অনেক অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেন। সৌদি আরব প্রবাসী ব্যবসায়ী মেহেদী হাসান সে সময় খোঁজখবর নেন এবং আন্দোলনকারীদের সহযোগিতা করেছিলেন।
আন্দোলনের পূর্ণ নেতৃত্ব চলে আসে ছাত্রদলের কাঁধে
তামিম বলেন, ধারাবাহিক আন্দোলনের এক পর্যায়ে আন্দোলন দমাতে ২৩ জুলাই কোটা সংশোধন করে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করলে অনেক আন্দোলনকারী নিজেকে গুটিয়ে নেয়। তখন আন্দোলন কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ে। কিন্তু আমরা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা রাজপথ ছেড়ে যাইনি। ২৬ জুলাই গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র হাসপাতাল থেকে তিন সমন্বয়ক নাহিদ, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূইয়া, আবু বাকের মজুমদার গ্রেপ্তার হলে আন্দোলনের পূর্ণ নেতৃত্ব চলে আসে ছাত্রদলের কাঁধে। তখন আমরা ছাত্রজনতাকে একত্রিত করে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকি।
হঠাৎ হঠাৎ প্রচণ্ড ব্যথায় ফিজিওথেরাপিই আমার শেষ সম্বল
তিনি বলেন, ২৭ জুলাই আমি মারাত্মক আহত হই। র্যাবের হেলিকপ্টার থেকে গুলি ও টিয়ারগ্যাস ছুড়তে থাকলে মানুষের হুড়োহুড়িতে পড়ে গিয়ে কোমরে আঘাত পাই- তখন একজন আমাকে টেনে তোলেন। কিন্তু আমি দমে যাইনি, আমার উপলব্ধি হচ্ছিল যে আমার সহযোদ্ধারা জীবন দিচ্ছে সে জায়গায় তো আমি এখনো বেঁচে আছি।
আহত হওয়ার পরে ডা. শাহ আমান উল্লাহ, (বর্তমানে ড্যাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক) আমাকে দীর্ঘদিন চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। এখনও পুরোপুরি সুস্থ হইনি। হঠাৎ হঠাৎ প্রচণ্ড ব্যথায় ফিজিওথেরাপিই আমার শেষ সম্বল। আমার পরিবার যখন জানতে পারে আমি আন্দোলনে যাচ্ছি এবং আহত হয়েছি তখন আমাকে বারণ করলেও আমি আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকি এবং সর্বশেষ ৫ আগস্টের বিজয় নিশ্চিত করি।
জুলাইয়ের আশা-আকাঙ্ক্ষা তা সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি
আশাবাদ ব্যক্ত করে তামিম ইকবাল বলেন, ছাত্রজনতার দীর্ঘ ৩৬ দিনের আন্দোলনে আমাদের অনেক সহযোদ্ধা শহিদ হয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন, চোখ হারিয়েছেন- সব ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে স্বৈরাচার হাসিনার পতন ঘটে। তবে মনে অনেক কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছি। এখনও জুলাইয়ের যে আশা আকাঙ্ক্ষা রয়েছে তা সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি; এখনও অনেক জুলাইযোদ্ধা হাসপাতালের বিছানায় বিনা চিকিৎসায় কাতরাচ্ছে। সর্বোপরি জুলাইয়ের অর্জনকে সবাই মিলে টিকিয়ে রাখতে পারলেই, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।