ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

জওয়ানরা উল্লাস করছিল কে কতজনকে মেরেছে

বিডিআর বিদ্রোহে জিম্মি কিশোরীর স্মৃতিতে পিলখানার ৩৬ ঘণ্টা

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৫১ এএম
ফাবলিহা বুশরা। ছবি: সংগৃহীত

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় বিদ্রোহের নামে যে নৃশংস সেনা হত্যাযজ্ঞ হয় সেদিন পিলখানার ভেতরে আটকা পড়েছিলেন অনেকে। তখন ৯ম শ্রেণীর ছাত্রী ফাবলিহা বুশরা তাদেরই একজন।

তার বাবা তৎকালীন বিডিআর হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ লেফটেন্যান্ট কর্নেল লুৎফর রহমান খানও ওইদিন জওয়ানদের হাতে খুন হন।

১৪ বছর বয়সে বাবাকে হারানো এবং নৃশংসতার মধ্যে মা ও ভাইয়ের সঙ্গে ৩৬ ঘণ্টা পিলখানা কোয়ার্টার গার্ডে জিম্মি ছিলেন বুশরা। বুশরা বয়স এখন ২৩। ৯ বছর আগের ওই হৃদয়বিদারক ঘটনার ভয়াল স্মৃতি গণমাধ্যমকে তুলে ধরেছেন ফাবলিহা বুশরা।

সেদিন যা দেখেছিলেন:

দিনটা আসলে গোলাগুলির শব্দ দিয়ে শুরু হয়। আমি তখন ব্রেকফাস্ট করছিলাম। ওইদিন আমার ছুটি ছিল। আমাদের বাসাটা ছিল ডিজি আঙ্কেলের বাসাটার ঠিক পাশে। তো বাবা যখন কলটা দেয় তখন ফোনটা আমিই রিসিভ করেছিলাম। আমার সাথে তেমন কথা হয় নাই, শুধু বলছিলেন যে তোমার আম্মুকে দাও তোমার আম্মুর সঙ্গে কথা বলব।

তারপর বেশি গোলাগুলি শুরু হয়ে গেল। আমরা চারতলার উপর থাকতাম। একটা বুলেট এসে আমাদের জানালার রডটা বেকে ঘরে ঢুকে গেল। আমাদের বাসার নিচে তিনটা গাড়ি ছিল, গাড়িতে ওরা আগুন লাগিয়ে দিল।

বুশরা বলছিলেন, সৈনিকরা কেউ মুখে কাপড় বেঁধে, কেউ মাস্ক পরে ছিল। এতবেশি সৈনিক পিলখানায় তারা আগে কখনোই দেখেননি। তখন পর্যন্ত কোনো ধারণাও করতে পারেননি আসলে বাইরে কী ঘটছে বা তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে।

দুজন সৈনিক এসে আমাদেরকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছিল। এসময় একজন সৈনিক এসে আমার মায়ের বুকে বন্দুক ধরে বলছিল তুই শেষ, তুই শেষ। তোর জামাই কে? তোর জামাইতো শেষ। এসময় আমার মার দুই হাতে আমি ও আমার ছোট ভাই ধরা।

বুশরা বলেন, আমি জানতাম না কোয়ার্টার গার্ড কী জিনিস বা সেখানে কী করা হয়। আমাদের আগে পুরাতন ডিজি কোয়ার্টার থেকে কিছু ফ্যামিলি নিয়ে আসা হয়েছিল। আমাদের সামনে লাইন ধরে ধরে রুমটার মধ্যে যখন সবাইকে ঢুকাচ্ছিল।

সবচেয়ে বীভৎস যেটা লাগছিল যে ওনারা বেধড়কভাবে অফিসারের মিসেস যারা, ইভেন মা এবং সন্তানদের পেটাচ্ছিল। তখন আমার পেছনে একটা লাথি লাগে। আমার কানের পেছনে বন্দুকের বাঁট দিয়ে একটা আঘাত করে।

বুশরা জানান, একটা রুমে ৭০/৮০ জনকে গাদাগাদি করে রাখা হয়। এ সময় বিডিআর জওয়ানরা উল্লাস করছিল এবং কে কয়জনকে মেরেছে সেটি জানান দিচ্ছিল। জিম্মি অবস্থায় অল্প বয়সে নৃশংস ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী হয়েছিলেন কিশোরী বুশরা।

একজন ধুপী ছিলেন উনি একজন অফিসারকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু উনি সৈন্যদের হাতে ধরা পড়ে যান। আমরা বাইরে বসে দেখছিলাম যে, তার ওপর জাস্ট ২০-২৫ জন লোক ঝাঁপিয়ে পড়লো। এবং তাকে যে যে জিনিস পাচ্ছে তাই দিয়ে পেটাচ্ছে। লোকটার চিৎকার আমি কোনোদিন ভুলবোনা। আমি অনেক রাত ঘুমাতে পারি নাই এই জিনিসটা এক্সপিরিয়েন্স করার পর।

কোয়ার্টার গার্ডে বুশরা তার মা ও ভাইয়ের সঙ্গে একরুমে অবরুদ্ধ ছিলেন। সেখানে এক ঘটনা কিশোরী বুশরার জন্য মারাত্মক ভীতির সঞ্চার করেছিল।

আমি আর আমার মা পাশাপাশি বসে ছিলাম। গরাদের দরজার ভেতর দিয়ে বন্দুক ঢুকিয়ে নল দিয়ে আমার দিকে তাক করে একজন বলছিলেন, চোখ বন্ধ কর, চোখ বন্ধ কর। হাসতেছে আর বলতেছে যে কিছু বোঝা যাবে না চোখ বন্ধ কর।

দে ওয়্যার লাফিং দ্যাট ইট ওয়াজ অ্যা জোক। আমি যে ভয় পাচ্ছি, আমি যে গুটিয়ে যাচ্ছি - এই জিনিসটা দেখে ওরা খুব আনন্দ পাচ্ছিল।

আমাদের কোনো ডাউট ছিলনা যে ওরা আমাদের মেরে ফেলবে। আমরা শুধু ওয়েট করছিলাম যে কখন মারবে।

বুশরা জানান, ৩৬ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার সময় তারা দোয়া-কলেমা পড়েছেন। শুধু পানি খেয়ে কাটিয়েছেন পুরোটা সময়। রাতে একটু ঘুমিয়েছিলেন স্যান্ডেল মাথায় দিয়ে। যখন পিলখানা থেকে বের হন তখনো আতঙ্ক কাটেনি তাদের।

আমাদেরকে যখন বলা হয়ছিল যে তোমরা চলে যাও। ট্রাকে করে উঠিয়ে দেয়া হচ্ছিল আমাদের। আমরা তখন যেতে চাচ্ছিলাম না। ঘটনার বীভৎসতাটা এত বেশি ছিল যে আমাদের মনে হচ্ছিল যে আমরা গাড়িতে উঠবো আর আমাদের পেছন থেকে গুলি করবে।

বুশরা বলেন, আমার কাছে মনে হয় যে, এই সময়টা নিজেদের জিম্মি থাকার অভিজ্ঞতাটা যতটা কষ্টকর ছিল, তার চাইতে মনে হয় আমার বাবার জন্য অপেক্ষা করা- আর তারপরে তার লাশ পাওয়ার অভিজ্ঞতাটা আরো কষ্টকর ছিল।

আমি তিনবার আইসিইউতে গিয়েছিলাম। আমার বাবার যেদিন জানাযা ছিল সেদিন আমাকে চারটা সিডেটিভ দেয়া হয়েছিল টু কাম মাই নার্ভস। আমি কাঁদতে পারতাম না। আমি চিৎকার করতাম। আমার অনেক আউটবার্স্ট হতো। আমি এই জিনিসটা মেনেই নিতে পারিনি।

বুশরা বলছিলেন ওই ঘটনার পর ৭ বছর পর্যন্ত টানা মানসিক চিকিৎসা আর থেরাপির মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে।

আরও পড়ুন

এটা আইরনিক যে আমার বাবা সাইকিয়াট্রিস্ট ছিলেন আর আমারই অনেক সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে ঘুরতে হয়েছে ফর মাই পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার। আমাকে অনেক ওষুধ খেতে হয়েছে। অনেক থেরাপি নিতে হয়েছে। আউটবার্স্ট ছিল। অ্যাঙ্গার সমস্যা ছিল।

আমি খুবই ইমোশনালি আনস্টেবল হয়ে গিয়েছিলাম যেটা সত্যিকথা। কারণ, আমার বাবার প্রতি এত এটাচড ছিলাম আর পুরো ঘটনাটা আমি কিছুই এড়াতে পারি নাই। মাইন্ড ডাইভার্ট করতে পারি নাই। আমার পড়াশোনার ক্ষতি হতো। পড়াশোনা করতে চাইতাম না। আমার মানসিক অবস্থা দেখে অনেকে চিন্তা করতো যে আমি হয়তো আর পড়াশোনায় এগিয়ে যেতে পারবো না!

৯ বছর পর এখন:

মৃত্যুবার্ষিকী এলে তিনি চেষ্টা করেন, তার যে শোক সেটা ব্যক্তিগতভাবে পালন করতে। সবাই চলে যাওয়ার পরে কবরস্থানে যান । একটু নিজের মতো করে যতটুকু সময় পার করা যায় এটাই চেষ্টা করেন।

তিনি এখন একটা মেডিকেল কলেজে পড়ছেন।

তিনি বলেন, ইনশাআল্লাহ এ বছর গ্রাজ্যুয়েশন করে যেতে পারব। কিন্তু মনের দিক থেকে কখনোই এটা থেকে আমি রিকভার করতে পারব না।

২০০৯ সালের ঘটনাকে বিদ্রোহ বলতে চান না বুশরা

তিনি বলেন, আমরা যারা ভেতরে ছিলাম আমরা কোনো বিদ্রোহ দেখিনি। কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া দেখিনি। আমরা মানুষ মারার পর তাদের উল্লাস দেখেছি। আমরা মানুষকে নির্যাতন করা দেখেছি। ছোট ছোট বাচ্চাকে গিয়ে গালিগালাজ করা, মহিলাদের গায়ে হাত দেওয়া- এটা কী ধরনের প্রতিবাদ?

আমি এটাকে বিদ্রোহ বলতে চাই না, আমরা কেউই এটাকে বিদ্রোহ বলতে চাই না। আমি এটাকে কারনেজ বলতে চাই। আমি এটাকে ম্যাসাকার বলতে চাই।

বিদ্রোহ করা হয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে। আমার বাবা কী অন্যায় করেছিলেন?

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
বাংলাদেশ-সৌদি ‘ভাসমান হাসপাতাল’র সেবা পেয়েছেন ৬ লাখেরও বেশি রোগী
সৌদি আরবের সহযোগিতায় বাংলাদেশ সরকারের এই জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের ফলে অবহেলিত গড়ইখালী ও আশপাশের অঞ্চলের দুস্থ মানুষের দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্য বঞ্চনার অবসান হতে চলেছে।
বাংলাদেশ-সৌদি ‘ভাসমান হাসপাতাল’র সেবা পেয়েছেন ৬ লাখেরও বেশি রোগী
উলশী-যদুনাথপুর প্রকল্পের ৫০ বছর: স্বেচ্ছাশ্রমে গ্রামীণ উন্নয়নের ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত
দেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে জনসম্পৃক্ততার এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত উলশী-যদুনাথপুর খাল খনন প্রকল্পের ৫০ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। ১৯৭৬ সালের এই দিনে যশোরের শার্শা উপজেলায় তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান খনন কাজের উদ্বোধন করেন।
উলশী-যদুনাথপুর প্রকল্পের ৫০ বছর: স্বেচ্ছাশ্রমে গ্রামীণ উন্নয়নের ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত
শব্দদূষণের নতুন ৪ উৎস শনাক্ত
পরিবেশ অধিদপ্তর শব্দদূষণের নতুন চারটি উৎস শনাক্ত করেছে। এসব উৎস থেকে অতিরিক্ত বা অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দ সৃষ্টি হলে, তা মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
শব্দদূষণের নতুন ৪ উৎস শনাক্ত
সাধুসঙ্গে নিজেকে ও অজানাকে জানছেন লালন ভক্তরা
‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ আধ্যাত্মিক এই বাণীকে সামনে নিয়ে একতারা, দোতারা আর ঢোল বাশির সুরে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছে লালন ফকিরের ভবের হাট। 
সাধুসঙ্গে নিজেকে ও অজানাকে জানছেন লালন ভক্তরা
নজর কাড়ছে ৪০ কেজি শস্যদানার দুর্গাপ্রতিমা
দূর থেকে মনে হচ্ছে যেন সোনালি চাদরে মোড়ানো দেবী দুর্গা। কিন্তু একি কাছে যেতেই পুরো ভিন্ন চিত্র। এ কোনো আবরণ নয় প্রতিমার পুরো শরীরজুড়ে রয়েছে ছোট ছোট শস্যদানা, তাও আবার সেটি নাকি মানুষের নয় পরিচিত পাখির খাবার হিসেবেই। যা আবার ফলে বিদেশের মাটিতে। ব্যতিক্রমী এই প্রতিমা তৈরি করে নজির গড়েছেন নাটোরের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। 
নজর কাড়ছে ৪০ কেজি শস্যদানার দুর্গাপ্রতিমা
আরও পড়ুন
বিডিআর বিদ্রোহে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের কবর জিয়ারত প্রধানমন্ত্রীর
বিডিআর বিদ্রোহ নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী