images

বিশেষ প্রতিবেদন

যেমন ছিল একাত্তরের ঈদ

শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬ , ০২:৫৭ পিএম

১৯৭১ সালের ঈদুল ফিতর বাঙালির জীবনে এসেছিল এক ভিন্ন রূপে— নেই উৎসবের আনন্দ, নেই কোলাহল, নেই নতুন পোশাকের উচ্ছ্বাস। চারদিকে তখন যুদ্ধ, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা। পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞে বিপর্যস্ত জনজীবনের মাঝেই ক্যালেন্ডারের নিয়ম মেনে চলে আসে ঈদ, কিন্তু মানুষের মনে তার কোনো উজ্জ্বলতা ছিল না।

অবরুদ্ধ ঢাকায় নিরানন্দ ঈদ

মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকা ছিল এক আতঙ্কিত নগরী। রাস্তায় রাস্তায় সেনা টহল, মাঝেমধ্যে গুলির শব্দ—মানুষের দিন-রাত কেটেছে ভয় আর দুশ্চিন্তায়। ঈদের দিনও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ভোরবেলা অনেকেই ঘুম থেকে জেগে উঠেছেন গোলাগুলির শব্দে।

সেই ঈদে শহরে ছিল না কোনো উৎসবের প্রস্তুতি। নতুন কাপড় কেনা হয়নি, ঘর পরিষ্কার করা হয়নি, রান্নাঘরে ছিল না বিশেষ আয়োজন। অনেকেই ঈদের নামাজে যেতে সাহস পাননি। কেউ কেউ ঘরেই নামাজ আদায় করেছেন, আবার অনেকে সেটিও বাদ দিয়েছেন। ঢাকার রাস্তাঘাট ছিল প্রায় জনশূন্য—যেন উৎসব নয়, শোকের দিন।

গ্রামবাংলায় বেঁচে থাকার লড়াই

গ্রামাঞ্চলের অবস্থা ছিল আরও করুণ। আগুনে পোড়া ঘরবাড়ি, গণহত্যার স্মৃতি আর পালিয়ে বেড়ানোর জীবন—এসবের মধ্যে ঈদ যেন এক অচেনা শব্দ। অনেক পরিবারে সেদিন ভালো খাবার তো দূরের কথা, স্বাভাবিক খাবার জোটানোই ছিল কঠিন। শিশুদের জন্য নতুন পোশাক কেনা ছিল কল্পনার বাইরে।

যারা নামাজে গিয়েছিলেন, তারাও দ্রুত ফিরে এসেছেন ঘরে। কোলাকুলি বা আনন্দ ভাগাভাগির দৃশ্য প্রায় ছিল না বললেই চলে।

রণাঙ্গনে ঈদ: যুদ্ধের মাঝেই প্রার্থনা

মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ঈদ মানে ছিল দায়িত্ব আর সংগ্রামের আরেকটি দিন। কোথাও কোথাও তারা ঈদের নামাজ আদায় করেছেন, তবে চরম সতর্কতার মধ্যে। সহযোদ্ধারা অস্ত্র হাতে পাহারায় দাঁড়িয়ে থেকেছেন, যাতে নামাজের সময় শত্রুপক্ষ আক্রমণ করতে না পারে।

খাবারের আয়োজন ছিল সামান্য— কোথাও সেমাই, কোথাও এক টুকরো মাংস। অনেকেই খেতে বসে পরে জানতে পেরেছেন, সেদিন ঈদ। পরিবার থেকে দূরে থাকা যোদ্ধাদের চোখে তখন ভেসে উঠেছে আপনজনের মুখ, অনেকেই চুপচাপ চোখের পানি ফেলেছেন।

প্রবাসী সরকারের সাদামাটা আয়োজন

ভারতের কলকাতায় অবস্থানরত অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারও ঈদ পালন করেছে খুবই সাধারণভাবে। নামাজ ও আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের বাইরে তেমন কোনো আয়োজন ছিল না। বিশেষ খাবারও ছিল না সেদিন।

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বাসাতেও ছিল না উৎসবের আমেজ। সাধারণ খাবারেই কেটেছে দিন। তিনি নিজে ঈদের দিন কাটিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে, তাদের খোঁজখবর নিতে গিয়ে।

শরণার্থী শিবিরে নিঃস্ব মানুষের ঈদ

আরও পড়ুন
Web-Image---Copy

‘হয় বাঁচব নয় মরব, স্বৈরাচার হাসিনার পতন করবই করব’

যুদ্ধের সময় প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়। শিবিরগুলোতে ছিল তীব্র খাদ্যসংকট। ঈদের দিনও সেখানে ছিল না আনন্দের কোনো ছাপ।

শিশুরা নতুন কাপড় পায়নি, অনেকেই পেট ভরে খেতে পারেনি। কোথাও সামান্য সেমাই রান্না করে ঈদের অনুভূতি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল কঠিন—ক্ষুধা, কষ্ট আর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা।

বেদনার মাঝেও আশার আলো

সব মিলিয়ে, ১৯৭১ সালের ঈদ ছিল এক নিঃশব্দ, বেদনাভারাক্রান্ত দিন। তবুও মানুষের মনে ছিল একটাই আশা— স্বাধীনতা। সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটে খুব শিগগিরই, ডিসেম্বরের বিজয়ের মধ্য দিয়ে।

এই ঈদ তাই শুধু একটি উৎসবের গল্প নয়; এটি বাঙালির ত্যাগ, সংগ্রাম আর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার এক গভীর স্মৃতি।

আরটিভি/এমএইচজে