সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬ , ০৭:৪৪ পিএম
ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই সোনালি ট্রফি ঘিরে আবেগ, উম্মাদন ও হৃদস্পন্দন। ঘাম আর রক্ত ঝরিয়ে সবুজগালিচায় ট্রফিটি একবার উঁচিয়ে ধরা বিশ্বের প্রত্যেক ফুটবলারের আজীবনের স্বপ্ন। ঝলমলে এই ট্রফিটির পেছনে রয়েছে এক শ্বাসরুদ্ধকর ইতিহাস।
বিশ্বাকপ ফুটবলের প্রথম পর্দা ওঠে ১৯৩০ সালে সুদূর উরুগুয়েতে। তখন এই ট্রফির নাম ছিল ‘ভিক্টরি’ বা বিজয়ের ট্রফি। পরে বিশ্ব ফুটবলের তৃতীয় সভাপতি জুলে রিমের অসামান্য অবদানের প্রতি সম্মান জানিয়ে এর নামকরণ হয় ‘জুলে রিমে ট্রফি’। ফরাসি ভাস্কর আবেল লাফ্লেউরের হাতে গড়া এই ট্রফিতে খোদিত ছিল গ্রিক বিজয়ের দেবী ‘নাইকি’-এর অবয়ব। সোনালি প্রলেপযুক্ত খাঁটি রুপা এবং মূল্যবান নীল রঙের ল্যাপিস লাজুলি পাথরের ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো ট্রফিটির উচ্চতা ছিল ৩৫ সেন্টিমিটার; আর ওজন প্রায় পৌনে ৪ কিলোগ্রাম।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ট্রফিটি প্রচণ্ড হুমকির মুখে পড়েছিল। কিন্তু ইতালীয় ফুটবল কর্তা ওত্তোরিনো বারাসসি অসীম সাহসিকতায় নাৎসি বাহিনীর লুণ্ঠন থেকে ট্রফিটি বাঁচাতে সক্ষম হয়। ১৯৩৯ সালে তিনি রোমের একটি ব্যাংকের সিন্দুক থেকে ট্রফিটি গোপনে সরিয়ে বাড়ির বিছানার নিচে একটি জীর্ণ জুতার বাক্সে লুকিয়ে রাখেন। তার এই অসামান্য উপস্থিত বুদ্ধির ফলেই বিশ্বযুদ্ধের নির্মম ধ্বংসযজ্ঞ ও লুটতরাজ থেকে রক্ষা পায় ফুটবলের প্রথম সোনালি ইতিহাস।
১৯৬৬ সালে ফুটবলের জন্মভূমি ইংল্যান্ডে ঘটে আরেক বিপত্তি। বিশ্বকাপের মাত্র চার মাস আগে লন্ডনের একটি সুরক্ষিত প্রদর্শনী কেন্দ্র থেকে ট্রফিটি চুরি হয়ে যায়। এ নিয়ে চারদিকে তোলপাড়, পুলিশের ঘুম হারাম এবং চোররা মুক্তিপণ দাবি করে বসেছে, ঠিক এক সপ্তাহ পর ঘটে এক নাটকীয় ঘটনা। ডেভিড করবেট নামের এক ব্যক্তি তার ‘পিকলস’ নামের কুকুর নিয়ে হাঁটতে বের হলে, পিকলসের প্রখর ঘ্রাণশক্তির জোরেই দক্ষিণ লন্ডনের একটি ঝোপের নিচ থেকে উদ্ধার হয় কাগজে মোড়ানো বিশ্বকাপ! এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের পর রাতারাতি তারকা বনে যায় পিকলস। জাতীয় সারমেয় প্রতিরক্ষা সংঘ থেকে পদক জয়ের পাশাপাশি সে পায় আজীবন বিনামূল্যে খাবারের সুযোগ এবং ইংল্যান্ড দলের রাজকীয় বিজয় উৎসবে অংশগ্রহণের বিরল সম্মান।
১৯৭০ সালে পেলে-জাদুতে তৃতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়ে জুলে রিমে ট্রফিটি চিরতরে নিজেদের করে নেয় ব্রাজিল। লাতিন আমেরিকার এই ফুটবল তীর্থের আনন্দ বেশিদিন টেকেনি। ১৯৮৩ সালের শেষদিকে ব্রাজিলের ফুটবল সদরদপ্তরের দুর্ভেদ্য কাচ ভেঙে ট্রফিটি আবারও চুরি হয়। তদন্তে জানা যায় চোররা ট্রফিটি গলিয়ে সোনার বার বানিয়ে ফেলেছিল। ফলে সেই আদি মুকুটটি আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে ২০১৫ সালে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সদরদপ্তরের ভূগর্ভস্থ কক্ষ থেকে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে ট্রফিটির ১৯৩০ সালের পুরোনো পাথরের ভিত্তিটুকু উদ্ধার করা হয়।
জুলে রিমে হাতছাড়া হয়ে গেলে ১৯৭৪ সাল চালু হয় বর্তমান নকশার বিশ্বকাপ। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ৫২টি নকশাকে পেছনে ফেলে ইতালীয় ভাস্কর সিলভিও গাজ্জানিগার তৈরি করা ট্রফিটি নির্বাচন করা হয়। ১৮ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি এবং ম্যালাকাইট পাথরের দুটি সবুজ বলয়যুক্ত এই ট্রফিতে দেখা যায়, দুজন মানবমূর্তি পরম উল্লাসে দুই হাতে পৃথিবীকে তুলে ধরেছে। এর উচ্চতা সাড়ে ৩৬ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৬ কিলোগ্রামের সামান্য বেশি। তবে এটি ভেতর থেকে সম্পূর্ণ ফাঁকা। বিশ্বকাপ যদি পুরোটাই সোনার হতো তবে এর ওজন দাঁড়াত প্রায় ৭০-৮০ কিলোগ্রাম। যা একজন খেলোয়াড়ের পক্ষে উঁচিয়ে ধরা কখনোই হতো না।
১৯৩০ সাল থেকে ২২টি আসরে খেলা হওয়া মাত্র আটটি দেশ শিরোপা জয়ের স্বাদ পেয়েছে। সর্বোচ্চ পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ব্রাজিল। জার্মানি ও ইতালি চারবার, বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা তিনবার, ফ্রান্স ও উরুগুয়ে দুবার এবং ইংল্যান্ড ও স্পেন একবার করে এই মুকুট জয় করেছে। বিজয়ী দেশগুলোর নাম ট্রফির নিচের অংশে তাদের মাতৃভাষায় খোদাই করা থাকে। তবে ২০৩৮ বা ২০৪২ সালের পর এই ট্রফিতে নতুন কোনো চ্যাম্পিয়নের নাম লেখার জায়গা থাকবে না। তখন হয়তো নতুন ট্রফির কথা ভাবতে হবে ফিফাকে।
আরটিভি/এমএম