সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬ , ১২:২৩ পিএম
৪৮ দল নিয়ে আয়োজিত ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬-এর গ্রুপ পর্ব শেষ হতেই ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হয়েছে রেকর্ডের পর রেকর্ড। ম্যাচসংখ্যা বাড়ার প্রভাব পড়েছে গোল, দর্শক উপস্থিতি, ব্যক্তিগত ও দলীয় অর্জন সব ক্ষেত্রেই। গ্রুপ পর্ব শেষ হওয়ার আগেই তৈরি হয়েছে অন্তত ৩২টি নতুন রেকর্ড, যার মধ্যে একাই আটটি নিজের নামে লিখিয়েছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি।
সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ খেলতে নেমেও দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন মেসি। গ্রুপ পর্বে ছয় গোল করে বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯, যা এখন টুর্নামেন্ট ইতিহাসের সর্বোচ্চ। পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ২৯টি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলা, ১৯টি ম্যাচে জয় এবং মোট ২ হাজার ৪৯০ মিনিট মাঠে থাকার নতুন রেকর্ডও গড়েছেন তিনি।
শুধু গোলেই নয়, ধারাবাহিক পারফরম্যান্সেও নতুন ইতিহাস লিখেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। টানা সাতটি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন ব্রাজিলের জাইরজিনহো ও ফ্রান্সের জুস্ত ফন্টেইনের রেকর্ড ভেঙে। এছাড়া গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে বিশ্বকাপে তার অবদান এখন ২৭টি গোলে, যা কিংবদন্তি পেলের ২১ গোল অবদানের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।
তবে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডও যুক্ত হয়েছে মেসির নামের পাশে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করার পর বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি তিনটি পেনাল্টি মিস করা খেলোয়াড়ও এখন তিনিই।
অন্যদিকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও নতুন ইতিহাস গড়েছেন। তিনি ও মেসি বিশ্বের প্রথম ফুটবলার হিসেবে ছয়টি বিশ্বকাপে মাঠে নামার কীর্তি গড়েছেন। এছাড়া টানা ছয়টি বিশ্বকাপেই গোল করা প্রথম খেলোয়াড় এখন রোনালদো। ৪১ বছর বয়সে গোল করে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বয়সী গোলদাতার তালিকাতেও জায়গা করে নিয়েছেন।
অভিজ্ঞদের তালিকায় নতুন মাইলফলক ছুঁয়েছেন ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদ্রিচ। ৪০ বছর ২৯১ দিন বয়সে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে অ্যাসিস্ট করার রেকর্ড গড়েছেন। আর জর্ডান হেন্ডারসনও হয়েছেন ইংল্যান্ডের প্রথম ফুটবলার, যিনি চারটি বিশ্বকাপ এবং সাতটি বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছেন।
কোচদের মধ্যেও রেকর্ডের ছড়াছড়ি ছিল। ফ্রান্সের দিদিয়ের দেশম বিশ্বকাপে কোচ হিসেবে সর্বোচ্চ ১৭টি ম্যাচ জয়ের রেকর্ড গড়েছেন। একই সঙ্গে একই দলের দায়িত্বে টানা চারটি বিশ্বকাপে থাকা কোচদের বিশেষ তালিকাতেও জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।
এদিকে কার্লোস কুইরোজ পাঁচটি বিশ্বকাপে কোচিং করিয়ে বোরা মিলুতিনোভিচের রেকর্ড স্পর্শ করেছেন। আর ডিক অ্যাডভোকাত ৭৮ বছর ২৭১ দিন বয়সে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে প্রবীণ কোচ হিসেবে ম্যাচ পরিচালনা করেছেন। হুগো ব্রোসও হয়েছেন সবচেয়ে বেশি বয়সী জয়ী কোচ।
গোলরক্ষকদের মধ্যেও এসেছে একাধিক নতুন রেকর্ড। কেপ ভার্দের ভোজিনিয়া ৪০ বছর পার হওয়ার পর একাধিক ক্লিন শিট রেখে ইতিহাসের তৃতীয় গোলকিপার হয়েছেন। একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি বয়সে বিশ্বকাপ অভিষেকের রেকর্ডও গড়েছেন তিনি। কুরাসাওয়ের এলোয় রুমও ইকুয়েডরের বিপক্ষে নির্ধারিত সময়ে ১৫টি সেভ করে বিশ্বকাপে নতুন রেকর্ড গড়েছেন।
দলীয় অর্জনেও ছিল চমক। প্রথমবারের মতো এক বিশ্বকাপে পাঁচ জোড়া ভাই অংশ নিয়েছেন। কেপ ভার্দে বিশ্বকাপ ইতিহাসে নকআউট পর্বে ওঠা সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে নাম লিখিয়েছে। পাশাপাশি ১৯৯৮ সালের চিলির পর প্রথম দল হিসেবে কোনো ম্যাচ না জিতেই তিন ড্র করে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে তারা।
ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইনও গ্যারি লিনেকারকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ ১১ গোলের মালিক হয়েছেন। এর মধ্যে পাঁচটি পেনাল্টি থেকে এসেছে, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে ঘানার বিপক্ষে ৭৮.৮ শতাংশ সময় বলের দখল রেখেও গোল করতে না পেরে একটি হতাশার রেকর্ডও গড়েছে ইংল্যান্ড।
আফ্রিকান দলগুলোর মধ্যেও নতুন ইতিহাস লিখেছে সেনেগাল। গ্রুপ পর্বে আট গোল করে তারা বিশ্বকাপে আফ্রিকার কোনো দলের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়েছে। ইরাককে ৫-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের এক ম্যাচে পাঁচ গোল করা প্রথম আফ্রিকান দলও তারা।
এছাড়া বেলজিয়ামের রোমেলু লুকাকু নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র পাঁচবার বল স্পর্শ করেই একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। রেফারিংয়েও নতুন ইতিহাস গড়েছেন অস্ট্রেলিয়ার আলিরেজা ফাগানি এবং আর্জেন্টিনার সহকারী রেফারি হুয়ান পাবলো বেলাত্তি। দুজনই চারটি বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনা করে সর্বোচ্চ রেকর্ডে নাম লিখিয়েছেন।
গ্রুপ পর্বেই রেকর্ডের বন্যা বইয়ে দেওয়া এই বিশ্বকাপ এখন প্রবেশ করেছে নকআউট পর্বে। শিরোপার লড়াই যত এগোবে, ততই ইতিহাসের খাতায় যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে আরও নতুন সব রেকর্ডের।
আরটিভি/এসকে