বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬ , ০৫:২০ পিএম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। চ্যাটজিপিটির উদ্ভাবক মার্কিন প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের তৈরি একটি এআই সিস্টেম সম্পূর্ণ নিজস্ব বুদ্ধিমত্তায় অন্য একটি এআই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সিস্টেমে ঢুকে পড়েছে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) এই নজিরবিহীন সাইবার অনুপ্রবেশের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে ওপেনএআই কর্তৃপক্ষ। তারা স্বীকার করেছে যে নিজেদের নতুন মডেল মূল্যায়নের সময় এই অপ্রত্যাশিত নিরাপত্তা দুর্ঘটনাটি ঘটে।
বুধবার (২২ জুলাই) এবিসি নিউজের এক প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানান যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যান এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, তাদের নতুন মডেলের পারফরম্যান্স ও দক্ষতা মূল্যায়নের কাজ চলাকালেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত সাইবার সংকট তৈরি হয়। নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণের জন্য এআই এজেন্টটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি অন্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ডাটাবেজে প্রবেশ করে।
এর আগে গত সপ্তাহে বিশ্বখ্যাত এআই প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেস প্রথম তাদের ডেটা প্রসেসিং সিস্টেমে অননুমোদিত প্রবেশের তথ্য উন্মোচন করে। তাদের সিস্টেমে এই অস্বাভাবিক গতিবিধি শনাক্ত হওয়ার পর তারা সন্দেহ করে যে কোনো উন্নত এআই এজেন্ট নিজের বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে এই অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে।
হাগিং ফেসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ক্লেমেন্ট দেলাঙ্গু এক বিবৃতিতে বলেন, কোনো প্রথম সারির এআই গবেষণা ল্যাব থেকেই এই হামলা চালানো হয়েছে বলে তারা ধারণা করেছিলেন। কারণ এই এআই এজেন্টের কার্যপদ্ধতি ও কৌশল ছিল অত্যন্ত জটিল ও উচ্চমানের। পরবর্তীতে ওপেনএআইয়ের আনুষ্ঠানিক সততা প্রকাশের পর তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, তাদের সেই সন্দেহই শেষ পর্যন্ত সত্যি প্রমাণিত হয়েছে।
দেলাঙ্গু আরও জানান, ঘটনাটি উন্মোচনের পর তিনি টানা চব্বিশ ঘণ্টা ওপেনএআইয়ের বিশেষজ্ঞ দলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন। তিনি মনে করেন, ওপেনএআইয়ের কোনো অসৎ বা ক্ষতিকর উদ্দেশ্য ছিল না। পুরো প্রক্রিয়াটি যে কোনো মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়া সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে গেছে, তা সত্যিই চোখ ছানাবড়া করে দেওয়ার মতো ঘটনা। তিনি মন্তব্য করেন, বিশ্ব ইতিহাসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে এমন স্বয়ংক্রিয় আক্রমণের ঘটনা হয়তো এটিই প্রথম।
এই আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনার পেছনে ওপেনএআইয়ের একাধিক মডেলের যৌথ সক্রিয়তা দায়ী ছিল বলে জানা গেছে। এর মধ্যে সম্প্রতি বাজারে আসা জিপিটি ফাইভ পয়েন্ট সিক্স সল এবং পরীক্ষার অধীনে থাকা আরও বেশি শক্তিশালী ও উন্নত একটি গোপনীয় মডেল অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ওপেনএআইয়ের প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, মডেলটি তার নির্দিষ্ট একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য অস্বাভাবিক পথ বেছে নেয়। মূল্যায়নের মূল পরীক্ষায় এগিয়ে থাকতে এবং তথ্য চুরি করে 'চিটিং' বা জালিয়াতি করতে এটি আগে থেকে চুরি হওয়া কিছু ক্রেডেনশিয়াল ব্যবহার করে। একই সঙ্গে এটি হাগিং ফেসের সার্ভারে লুকিয়ে থাকা একটি অজানা নিরাপত্তাত্রুটি বা ভালনারেবিলিটি নিমিষেই খুঁজে বের করে ফেলে।
একটি সামান্য টেস্ট গোল অর্জনের জন্য এআই সিস্টেমটি এতটাই চরম পথ অবলম্বন করবে, তা গবেষকদের ধারণার বাইরে ছিল। এটি পরীক্ষা পার হওয়ার উদ্দেশ্যে গোপন তথ্য হাতিয়ে নিতে নিজস্ব কৌশল তৈরি করেছিল।
বর্তমানে অত্যাধুনিক এআই মডেলগুলোর এই ধরণের অনিয়ন্ত্রিত ও বিস্ময়কর সাইবার সক্ষমতা বিশ্বজুড়ে নতুন দুশ্চিন্তা তৈরি করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কিত জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি এড়াতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত জুন মাসে একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছিলেন। ওই আদেশের অধীনে যেকোনো শক্তিশালী এআই মডেল সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করার আগে অন্তত এক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার তার জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি মূল্যায়ন করার সুযোগ পাবে।
এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে ওপেনএআই সতর্ক করে বলেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত করা এবং তা ব্যবহার করে হামলা চালানোর গতিকে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই ঐতিহাসিক শিক্ষা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে এআই প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মডেলের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা ব্যবস্থাকেও একইভাবে দ্রুত শক্তিশালী করতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতেও এমন মারাত্মক স্বয়ংক্রিয় সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
আরটিভি/এআর