বর্তমান সময়ে আমাদের বাড়ি, অফিস, দোকান কিংবা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা জোরদার করতে এখন সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করি। তবে নিরাপত্তার পাশাপাশি এই ক্যামেরাই কখনও কখনও গোপনীয়তার বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হ্যাকারদের খপ্পরে পড়ে ব্যক্তিগত ভিডিও চলে যাওয়া, অনলাইনে ফাঁস হওয়া বা অনুমতি ছাড়া অন্যের ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করার একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব ঘটনার পেছনে জটিল হ্যাকিং নয়, বরং ব্যবহারকারীর কয়েকটি সাধারণ ভুলই দায়ী।
ডিফল্ট পাসওয়ার্ড বদলান
সিসি ক্যামেরায় সাধারণত ‘admin’, ‘123456’ বা নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া ডিফল্ট পাসওয়ার্ড নিয়েই ব্যবহার করা হয়।
এটি বড় ঝুঁকিগুলোর মধ্যে অন্যতম। কারণ এসব ডিফল্ট তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই প্রকাশ্যে পাওয়া যায়। ফলে সাইবার অপরাধীরা স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার ব্যবহার করে খুব সহজেই এসব ক্যামেরায় ঢোকার চেষ্টা করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ক্যামেরা চালু করার পরই ডিফল্ট পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে বড়-ছোট হাতের অক্ষর, সংখ্যা ও বিশেষ চিহ্ন মিলিয়ে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা উচিত।
একই পাসওয়ার্ড পুনরায় ব্যবহার না করা
অনেকেই ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সিসি ক্যামেরার জন্য একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেন।
এর ফলে একটি অ্যাকাউন্টের তথ্য ফাঁস হলে একই পাসওয়ার্ড দিয়ে অন্য অ্যাকাউন্টেও ঢোকার সুযোগ তৈরি হয়। সাইবার নিরাপত্তায় এটিকে ‘ক্রেডেনশিয়াল স্টাফিং’ নামে পরিচিত একটি আক্রমণ কৌশল হিসেবে ধরা হয়।
সফটওয়্যার আপডেট
সিসি ক্যামেরাও এক ধরনের কম্পিউটার। তাই এতে থাকা সফটওয়্যার বা ফার্মওয়্যারে নিরাপত্তাজনিত ত্রুটি থাকতে পারে।
প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত আপডেটের মাধ্যমে এসব ত্রুটি ঠিক করে। কিন্তু ব্যবহারকারী যদি সেই আপডেট ইনস্টল না করেন, তাহলে পুরোনো দুর্বলতাগুলো কাজে লাগিয়ে হ্যাকাররা প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে।
টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখুন
যেসব ক্যামেরা বা মোবাইল অ্যাপ টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন সমর্থন করে, সেখানে এটি চালু রাখা উচিত।
এতে পাসওয়ার্ড জেনে গেলেও অতিরিক্ত নিরাপত্তা যাচাই ছাড়া অন্য কেউ সহজে আপনার ক্যামেরায় প্রবেশ করতে পারবে না।
পাবলিক ওয়াইফাই দিয়ে ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ না করা
হোটেল, ক্যাফে বা বিমানবন্দরের উন্মুক্ত ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক সব সময় নিরাপদ নাও হতে পারে।
এসব নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ বা লগইন করলে তথ্য চুরির ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। প্রয়োজনে মোবাইল ডেটা বা নিরাপদ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করাই ভালো।
অচেনা অ্যাপ ব্যবহার করবেন না
অনেকেই অতিরিক্ত সুবিধার আশায় তৃতীয় পক্ষের (থার্ড পার্টি) অ্যাপ ব্যবহার করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভব হলে ক্যামেরা নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল অ্যাপ ব্যবহার করাই নিরাপদ। অজানা উৎস থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করলে ব্যক্তিগত তথ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ক্যামেরার অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ
প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি ক্যামেরা কোথায় বসানো হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
শোবার ঘর, বাথরুম বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার স্থানগুলোতে ক্যামেরা বসানো থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ নিরাপত্তা ভাঙলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তাই।
ক্লাউড স্টোরেজ ব্যবহারে সতর্ক থাকুন
অনেক আধুনিক সিসি ক্যামেরার ভিডিও সরাসরি ক্লাউডে সংরক্ষিত হয়। ক্লাউড সেবা ব্যবহার করলে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড, ২-ধাপ যাচাই এবং নিয়মিত লগইন কার্যক্রম পরীক্ষা করা উচিত। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় পুরোনো ডিভাইসের অ্যাক্সেস মুছে ফেলাও জরুরি।
পুরোনো ক্যামেরা বিক্রির আগে যা করবেন
পুরোনো ক্যামেরা বিক্রি বা অন্যকে দেওয়ার আগে শুধু মেমোরি কার্ড খুলে ফেললেই যথেষ্ট নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিভাইসটি ‘ফ্যাক্টরি রিসেট’ করে সব অ্যাকাউন্ট থেকে লগআউট করতে হবে। প্রয়োজনে ক্লাউড অ্যাকাউন্ট থেকেও ডিভাইসটি অপসারণ করতে হবে।
কীভাবে বুঝবেন আপনার ক্যামেরা ঝুঁকিতে?
নিচের লক্ষণগুলো দেখা গেলে সতর্ক হওয়া উচিত—
পাসওয়ার্ড নিজে থেকে পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া।
অচেনা ডিভাইস থেকে লগইনের নোটিফিকেশন।
ক্যামেরা নিজে থেকে ঘুরে যাওয়া (পিটিজেড ক্যামেরার ক্ষেত্রে)।
অস্বাভাবিক ডেটা ব্যবহার।
অচেনা সময়ে ক্যামেরা অনলাইন দেখা যাওয়া।
নিরাপত্তা শুরু হয় সচেতনতা থেকে।
সর্বোপরি, সিসি ক্যামেরা নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্যই ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সামান্য অসাবধানতায় সেটিই ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল তথ্য ফাঁসের কারণ হতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, নিয়মিত আপডেট, টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখা এবং অফিসিয়াল সফটওয়্যার ব্যবহারের মতো কয়েকটি সহজ অভ্যাসই অধিকাংশ ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দিতে পারে।
প্রযুক্তি যত স্মার্ট হচ্ছে, ততই বাড়ছে সাইবার ঝুঁকি। তাই শুধু ক্যামেরা কেনাই নয়, সেটিকে নিরাপদ রাখা—এটিও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আরটিভি/এমএম

