ঈদের দ্বিতীয় দিনে ঢাকার মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানায় নতুন করে যুক্ত হওয়া আলোচিত মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’কে দেখতে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে।
শুক্রবার (২৯ মে) দুপুরে জাতীয় চিড়িয়াখানায় ঢুকতেই ভেসে আসছে শিশুদের চিৎকার, মোবাইল ক্যামেরার ক্লিক আর মানুষের কৌতূহলী গুঞ্জন।
কেউ বলছেন, ওই যে ডোনাল্ড ট্রাম্প!, কেউ আবার ভিড় ঠেলে একটু সামনে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে ছোট্ট এক শিশু বাবার হাত টেনে বলছে, আরেকটু কাছে যাই না! ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’এর খাঁচার সামনে এমন দৃশ্য চোখে পরে।
মাথাভর্তি ঢেউ খেলানো সোনালি চুল, গোলাপি আভাযুক্ত শরীর আর অস্বাভাবিক গড়নের কারণে গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম পর্যন্ত আলোচনার কেন্দ্রে ছিল এই বিরল মহিষ।
কোরবানির হাটের প্রাণী থেকে সেটি এখন জাতীয় চিড়িয়াখানার নতুন আকর্ষণ।
শুক্রবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শত শত দর্শনার্থী শুধু একনজর ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’কে দেখতেই ভিড় করছেন।
কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, কেউ আবার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মিল খুঁজছেন।
দেখা গেছে, চিড়িয়াখানার ভেতরে আলাদা একটি ঘেরাটোপে রাখা হয়েছে মহিষটিকে। দর্শনার্থীদের কোলাহলের মাঝেও বেশ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিল সেটি। কখনো ক্লান্ত হয়ে ধীরে ধীরে মাটিতে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’।
পাইকপাড়ার খামার থেকে ভাইরাল খ্যাতি
এই ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’-এর গল্প শুরু নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকপাড়ার রাবেয়া এগ্রো ফার্মে।
খামারের মালিক জিয়াউদ্দিন মৃধার ভাই প্রথম মহিষটির মাথার ঢেউ খেলানো চুল দেখে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মিল খুঁজে পান। পরে মজার ছলেই নাম রাখা হয় ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। কিন্তু সেই নামই পরে বদলে দেয় মহিষটির ভাগ্য।
গোলাপি রঙের বিরল এই মহিষটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়ে যায়। শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও খবর প্রকাশ হয় প্রাণীটিকে নিয়ে। প্রতিদিন শত শত মানুষ ভিড় করতে থাকেন খামারে।
ঈদ সামনে রেখে মহিষটি কোরবানির জন্য বিক্রিও করা হয়। ২৫ মে নতুন মালিক নিতে এলে লাল গালিচা বিছিয়ে রাজকীয় আয়োজনের মাধ্যমে বিদায় জানানো হয় তাকে। সেই ভিডিওও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। শেষ পর্যন্ত কোরবানি হয়নি ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’র।
রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে চিড়িয়াখানায়
ঈদুল আজহার একদিন আগে বুধবার (২৭ মে) সরকারের হস্তক্ষেপে মহিষটিকে জাতীয় চিড়িয়াখানায় নিয়ে আসা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এটি বিরল অ্যালবিনো প্রজাতির হওয়ায় সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। প্রথমে স্থানীয় থানা হেফাজতে নেওয়া হয় প্রাণীটিকে। পরে রাতেই সেটিকে মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানায় আনা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব কেএম নাজমুল হক বলেন, এটি একটি রেয়ার ব্রিড হওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে সংরক্ষণের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, পরিবহনের সময় মহিষটির পেটের পাশে সামান্য আঘাত লাগে। বর্তমানে চিকিৎসা চলছে এবং সেটি পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মহিষটির শরীরের এক পাশে ওষুধ লাগানো রয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছেন।
এদিকে, ঈদের আনন্দে অন্যত্র বেড়াতে না গিয়ে বেশিরভাগ দর্শনার্থী শুধু এই মহিষটিকে দেখতে চিড়িয়াখানায় এসেছেন। কেউ কেউ বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে আসলেও বেশিরভাগই পরিবার নিয়ে এসেছেন। এদের মধ্যে ছোট দর্শনার্থীর সংখ্যাও কম নয়।
সাভার থেকে আসা যুবক রিফাত হোসেন বলেন, কালকে খবর দেখেই ঠিক করেছি আসব। সকাল ১০টার মধ্যেই চলে এসেছি। এতদিন শুধু ফেসবুকে দেখেছি, এখন সামনে থেকে দেখলাম। চুল আর মুখের কাটিংয়ে কিছুটা মিল তো আছেই।
বাড্ডা থেকে পরিবার নিয়ে আসা গৃহিণী রোকসানা আক্তার বলেন, বাচ্চারা অন্য কিছু দেখতে চায়নি। ঢুকেই বলছে আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেখতে হবে। কাছে থেকে দেখে অনেক ভালো লাগছে।
আরেক দর্শনার্থী হাসতে হাসতে বলেন, ট্রাম্পের চোখ, কপাল আর হেয়ার, এই তিনটার সঙ্গে মিল আছে। তবে আমি ভাবছিলাম আরও বড় হবে! শিশুদের মাঝেও ছিল বাড়তি উচ্ছ্বাস।
আট বছরের শিশু তামিম বলে, অনেক সুন্দর লাগছে। আগে কখনো এমন মহিষ দেখি নাই।
দর্শনার্থীদের অনেকে মনে করছেন, মহিষটিকে কোরবানি না করে সংরক্ষণ করার সিদ্ধান্ত সঠিক হয়েছে।
মিরপুরের বাসিন্দা শাহীন মিয়া বলেন, এটা যদি কোরবানি হয়ে যেত, তাহলে তো শেষ। এখন অন্তত দেশের মানুষ দেখতে পারছে। বাচ্চারাও একটা বিরল প্রাণী সম্পর্কে জানতে পারছে।
এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল অনেক কিছুই দেখি। কিন্তু বাস্তবে সামনে এসে দেখার অভিজ্ঞতা আলাদা।
অনেকে আবার মজা করে বলছিলেন, আমেরিকার ট্রাম্পকে তো সামনে থেকে দেখা যাবে না, তাই মহিষ ট্রাম্পকেই দেখতে এলাম!
বিরল কেন এই মহিষ?
প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি অত্যন্ত বিরল ধরনের মহিষ। এ ধরনের অ্যালবিনো বৈশিষ্ট্যের মহিষ প্রতি ১০ লাখে একটি পাওয়া যেতে পারে। এটি মূলত রিসেসিভ জিনের কারণে হয়। জেনেটিক ফ্যাক্টর এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, এ ধরনের প্রাণী শুধু দর্শনীয় নয়, গবেষণার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
এবারের ঈদের নতুন আকর্ষণ
জাতীয় চিড়িয়াখানার কর্মকর্তারা বলছেন, ঈদের দিনে সাধারণত দর্শনার্থীর চাপ তুলনামূলক কম থাকে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ঈদের দিন দুপুরের পর থেকেই ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’র ঘেরাটোপের সামনে ভিড় বাড়তে থাকে। অনেকেই শুধু এই মহিষটিকে দেখতেই টিকিট কেটে চিড়িয়াখানায় প্রবেশ করেছেন।
চিড়িয়াখানার এক কর্মকর্তা বলেন, এটা নতুন প্রাণী। আগে এখানে ছিল না। তাই মানুষের আগ্রহও বেশি। আগামী কয়েক দিনে আরও বেশি ভিড় হতে পারে।
ফ্রি থেকে টিকিটের ভেতরে
নারায়ণগঞ্জের খামারে থাকাকালে মহিষটিকে বিনামূল্যে দেখতে পারতেন মানুষ। তবে এখন সেটি দেখতে হলে চিড়িয়াখানার টিকিট কাটতে হচ্ছে।
জাতীয় চিড়িয়াখানায় প্রবেশের জন্য জনপ্রতি ৫০ টাকা দিতে হচ্ছে দর্শনার্থীদের। তবুও আগ্রহে কোনো কমতি নেই।
দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। কেউ সেলফি তুলছেন, কেউ লাইভ করছেন, কেউ আবার পরিবার নিয়ে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন বিরল সেই গোলাপি মহিষটির সামনে।
ভাইরাল থেকে বাস্তবের তারকা
কয়েক সপ্তাহ আগেও ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ ছিল মোবাইল স্ক্রিনের ভাইরাল এক প্রাণী। এখন সেটিই জাতীয় চিড়িয়াখানার নতুন তারকা।
কোরবানির হাটে যার শেষ গন্তব্য হওয়ার কথা ছিল জবাইখানা, সেটিই আজ শিশুদের বিস্ময়, দর্শনার্থীদের কৌতূহল আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নতুন আকর্ষণ।
ঈদের আনন্দের ভিড়ে তাই এবার জাতীয় চিড়িয়াখানার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ কোনো বাঘ, সিংহ বা হাতি নয়, বরং গোলাপি রঙের এক বিরল মহিষ, যার নাম ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’।




