টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকবাহী নৌকায় ভয়াবহ আগুন, সম্ভাব্য কারণ

আরটিভি নিউজ

শনিবার, ৩১ মে ২০২৫ , ০১:২৪ এএম


টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকবাহী নৌকায় ভয়াবহ আগুন, সম্ভাব্য কারণ
ছবি: সংগৃহীত

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার নিলাদ্রী লেকপাড় এলাকায় টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকবাহী একটি নৌকায় ভয়াবহ এক অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। শুক্রবার (৩০ মে) রাত ৮টার দিকে লাগা এ আগুনে নৌকাটির ৮০ শতাংশই পুড়ে গেছে। নৌকাটিতে ১২ জন পর্যটক ছিলেন। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গেই তারা নিরাপদে নেমে যেতে সক্ষম হন বলে জানা গেছে। 

বিজ্ঞাপন

তবে, আশঙ্কার ব্যাপার হচ্ছে, এমন ঘটনা এর আগেও ঘটেছে এবং বারবার ঘটছে। অভিজ্ঞতার আলোকে এমন অগ্নিকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ তুলে ধরেছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার তালহা বিন জসিম। 

শুক্রবার (৩০ মে) রাত ১২টার দিকে এক ফেসবুক পোস্টে এ বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি। একইসঙ্গে এ ধরনের অগ্নি দুর্ঘটনা এড়ানোর উপায় নিয়েও আলোচনা করেন তিনি। 

বিজ্ঞাপন

পোস্টে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের এ কর্মকর্তা পর্যটকবাহী নৌকায় এ অগ্নিকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে প্রথমেই উল্লেখ করেন গ্যাস সিলিন্ডার ও রান্নার চুলা ব্যবহারের কথা। সেখানে তিনি লিখেন, অনেক নৌকায় পর্যটকদের খাওয়ার ব্যবস্থা করতে গিয়ে রান্না করার জন্য গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করছে। কিন্তু গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের যে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা দরকার বেশির ভাগ নৌকায় সে ব্যবস্থা থাকেনা। এছাড়া রান্না ঘরের এতো ছোট হয়ে থাকে যে সেখানে একবার আগুন লাগলে অগ্নি নির্বাপণের সুযোগ পাওয়া যায় না। রান্না ঘরের চুলা ও গ্যাস সিলিন্ডারের অন্তত তিন ফুট দূরত্বে অন্যান্য সামগ্রি রাখতে হয় অগ্নি নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু বেশির ভাগ নৌকায় রান্না ঘরের এতবড় স্পেস থাকে না। এছাড়া গ্যাস সিলিন্ডার মেয়াদ না দেখে কেনা, নিরাপত্তা নিয়ম না মানা, পুরনো বা মানহীন সিলিন্ডার ব্যবহার, সিলিন্ডারের সংযোগ স্থান লিকেজ আছে কিনা তা প্রতিদিন পরীক্ষা না করার কারণে অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটে থাকে।  

তালহা বিন জসিমের মতে এ অগ্নিকাণ্ডের আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট। তিনি লিখেন, নৌকায় অপরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়। নৌকায় সৌর প্যানেল, জেনারেটর, ব্যাটারির মাধ্যেমে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হলেও অনেক সময় নিম্নমানের তার ব্যবহার করা হয় এবং ওয়ারিং ঠিকমতো করা হয় না। এতে অনেক সময় ওভারলোডিংয়ের ফলে শর্টসার্কিট হয়ে অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে।

বিজ্ঞাপন

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের এ কর্মকর্তা এরপর দায়ী করেন নৌকায় ধূমপানের বিষয়টিকে। তিনি লিখেন, অনেক পর্যটক নৌকায় ধূমপান করেন এবং সিগারেটের শেষাংশ পানিতে না ফেলে কাঠের নৌকায় ফেলেন। বাংলাদেশে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য বলছে, সারাদেশে অগ্নিকাণ্ডের জন্য দ্বিতীয় প্রধান কারণ হলো বিড়ি সিগারেটের শেষাংশ। ২০২৪ সালে সারাদেশে বিড়ি সিগারেটের জলন্ত টুকরা থেকে ৪১৩৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তাই এ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

তালহা বিন জসিমের মতে, নৌকায় এ ধরনের অগ্নিকাণ্ডের আরেকটি বড় সম্ভাব্য কারণ বারবিকিউ পার্টি। তিনি লিখেন, অনেক সময় পর্যটকরা নৌকার উন্মুক্ত স্থানে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নিয়েই বারবিকিউর জন্য চুলা ব্যবহার করে থাকেন। এখান থেকে অসতর্ক থাকলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে।  এছাড়া আতশবাজি ও ফানুস উড়ানো থেকেও আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তাই খোলা আগুন ব্যবহারের সাবধান হতে হবে। 

বিজ্ঞাপন

এছাড়া, নৌকার কাঠামো দাহ্য হওয়ায়ও এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড বারবার ঘটছে বলে অভিমত ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার তালহা বিন জসিমের। তিনি লিখেছেন, বেশিরভাগ নৌকা কাঠের তৈরি, ফলে একবার আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া নৌকার ডেকোরেশনের জন্য অতি দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এজন্য অগ্নিকাণ্ড ঘটলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্ষতি বেশি হয়ে থাকে। এছাড়া নৌকার রুমগুলো এতো ছোট হয়ে থাকে যে অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল বা আগুন প্রতিরোধী ব্যবস্থা থাকে না। এতে অগ্নিকাণ্ড ঘটলে অতি প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে। 

এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড এবং ভয়াবহতা এড়াতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের এ কর্মকর্তার পরামর্শ, এ রকম দুর্ঘটনায় পর্যটকরা কীভাবে নৌকা থেকে জরুরি বহির্গমন করবেন তা নৌকায় দৃশ্যমান জায়গায় লিখে রাখতে হবে। ভ্রমণের শুরুতে এ বিষয়ে পর্যটকদের ব্রিফিং করার ব্যবস্থা রাখতে হবে। এছাড়া বছরে অন্তত দুইবার জরুরি বহির্গমনের ফায়ার ড্রিল আয়োজন করা উচিত।

তালহা বিন জসিমের মতে, যেহেতু বেশিরভাগ পর্যটকবাহী নৌকা কাঠের তৈরি এবং এই ধরনের নৌকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে, এজন্য পর্যটক পরিবহনকারী নৌকাগুলোতে কাঠের বদলে লোহার সুরক্ষিত কাঠামো ব্যবহার উৎসাহিত করা উচিত। এছাড়া সরকার ও বিআইডব্লিউটিএ এর অনুমোদিত ডিজাইন অনুযায়ী নৌকা নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে। আর কাঠ ব্যবহার করলে কাঠের উপর অগ্নিপ্রতিরোধী ব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে। 

তিনি আরও লিখেন, নৌযানগুলো যেন নিয়মিত সেফটি চেক এবং ফিটনেস সার্টিফিকেট গ্রহণ করে, তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে করে নৌকার নিরাপত্তা যেমন নিশ্চিত হবে তেমনি পর্যটকরাও নিরাপদ থাকার আস্থা তৈরি হবে। নৌকার চালক ও সহকারীদের জন্য ফায়ার সেফটি ও ইমার্জেন্সি রেসপন্স প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত। শুধুমাত্র চালক ও সহকারীদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনলে হবে না, নৌকার বাবুর্চিদের সবার আগের অগ্নি নির্বাপণের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কারণ, দুর্ঘটনার সময় কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়, তা তারা জানেন না, ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এ ব্যাপারে নৌকার মালিকদের এগিয়ে আসা উচিত। তারা এই প্রশিক্ষণের জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর সহযোগিতা নিতে পারে। 

আরটিভি/এসএইচএম

 

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission