ঢাকার ধামরাইয়ে মেহমান হয়ে বেড়াতে আসা এক স্বামীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর ও তার স্ত্রীকে পালাক্রমে ধর্ষণের অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লেও সরেজমিনে গিয়ে এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক তথ্য পাওয়া গেছে।
ঘটনাস্থল, স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে ধর্ষণের কোনো নির্ভরযোগ্য বিবরণ মেলেনি।
গত ১৫ জানুয়ারি ধামরাই উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের রামরাবন এলাকায় শান্তি মনি দাসের বাড়িতে ঘটনাটি ঘটে। পরে ১৯ জানুয়ারি কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভাইরাল হওয়া খবরে বলা হয়, স্বামীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করে স্ত্রীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে। সেখানে স্থানীয় ইউপি সদস্য ও পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্যও যুক্ত করা হয়। তবে ঘটনাস্থলে গিয়ে এসব বক্তব্যে গরমিল দেখা গেছে। প্রায় পাঁচদিন পেরিয়ে গেলেও ভুক্তভোগী নারী কোনো অভিযোগও করেননি।
যা দেখা গেল ঘটনাস্থলে
সাটুরিয়া-কাওয়ালীপাড়া সড়ক থেকে বাম দিকে কাঁচা রাস্তা ধরে প্রায় ৩০০-৪০০ মিটার ভেতরে। সেখানে এক কক্ষের টিনের ঘরে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক মেয়েকে নিয়ে থাকেন শান্তি মনি দাস। বাড়ির পাশে রান্নাঘর, পেছনে টিউবওয়েল ও বাথরুম রয়েছে। ঘটনার দিন অতিথি আসায় তিনি ও তার মেয়ে ভাইয়ের বাড়িতে চলে যান। পরদিন তিনি ঘটনার কথা জানতে পারেন।
প্রতিবেশীরা জানান, মধ্যরাতে ওই ঘরে মারধরের শব্দ পেয়ে পাশের বাড়ির গৃহবধূ শিল্পী মনি দাস সেখানে যান। তিনি বলেন, রাত একটার দিকে শব্দ শুনে গিয়ে কাউকে পাননি, শুধু ওই নারী ও তার স্বামীকে ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। তখন ওই নারী জানান, তার গহনা, টাকা ও মোবাইল ফোন নেওয়া হয়েছে। গাছে বেঁধে রাখা বা ধর্ষণের কোনো চিহ্ন তিনি দেখেননি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো ঘটনা ৪–৫ মিনিটের মধ্যেই ঘটে। ঘটনার খবর পেয়ে রাতেই সেখানে যান কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাসের চাচাতো ভাই বিকাশ চন্দ্র মনি দাস।
তিনি জানান, দেড়টার দিকে খবর পেয়ে গিয়ে দেখেন ওই নারী কান্নাকাটি করছেন। তখন তিনি জানান, প্রায় ১৭–১৮ হাজার টাকা, দুটি কানের দুল, একটি নাকফুল ও একটি চেইন নিয়ে গেছে চোরেরা। স্বামীকে মারধরের কথা বলা হলেও কাউকে গাছে বাঁধা বা অন্য কোনো আলামত তিনি দেখেননি।
বালিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মন্টু চন্দ্র মনি দাস বলেন, পরদিন সকালে তিনি লুটপাটের কথা শুনেছেন। তবে কেউ তার কাছে অভিযোগ নিয়ে আসেনি। যারা ঘটনাস্থলে ছিলেন বা পরে গেছেন, সবাই মালামাল নেওয়ার কথাই বলেছেন, অন্য কিছু নয়।
শান্তি মনি দাস জানান, তার ভাই কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাসের সহকর্মী পরিচয়ে আব্দুর রাজ্জাক ও তার স্ত্রী পরিচয় দেওয়া এক নারী ওই রাতে বাড়িতে ছিলেন। তাদের থাকতে দিয়ে তিনি বাবার বাড়ি চলে যান। সকালে ঘটনা শোনেন।
কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাস জানান, সন্ধ্যায় রাজ্জাক ও তার স্ত্রী রামরাবনে আসেন। নিজের বাড়িতে জায়গা না থাকায় বোনের বাড়িতে তাদের থাকতে দেন। রাত দেড়টার দিকে রাজ্জাক ফোন করে জানান, কয়েকজন এসে তাদের গহনা, টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নিয়েছে এবং তাকে মারধর করেছে। ধর্ষণের বিষয়ে জানতে চাইলে ওই নারী এমন কোনো ঘটনার কথা বলেননি।
আব্দুর রাজ্জাকও একই কথা বলেন। তিনি জানান, রাত দেড়টার দিকে পাঁচজন এসে দরজা খুলতে বলে আলো নিভিয়ে দিয়ে তাদের মালামাল নিয়ে যায় এবং তাকে মারধর করে। ধর্ষণ বা স্ত্রীকে বেঁধে রাখার কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে তিনি দাবি করেন। তবে ওই নারীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেননি তিনি।
পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজ্জাকের প্রকৃত স্ত্রী ওই রাতে ধামরাইয়ে ছিলেন না। তার কর্মস্থল ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডেও ঘটনার পর থেকে তিনি অনুপস্থিত। গ্রামের বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, তার স্ত্রী ধামরাই যাওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।
ওসি নাজমুল হুদা খান বলেন, সংবাদমাধ্যম ও সূত্রে পাওয়া খবর থেকে আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসেছি। পরিদর্শনের সময় এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছি ও জিজ্ঞাসাবাদ করেছি।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বলা যায়, এখানে পালাক্রমে ধর্ষণ বা কোনো নারীর উপর যৌন নিপীড়নের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। যারা এই ঘটনা সংক্রান্ত অভিযোগ করতে চাইবেন, তারা আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন। তবে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে ধর্ষণ বিষয়ে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ইউপি সদস্যের কাছেও বিচারপ্রার্থী হিসেবে কেউ কোনো অভিযোগ জানায়নি। কোনো লোককে বাধা দিয়ে বা অস্ত্রের মুখে ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংবাদমাধ্যমে উল্লেখিত এসআই হারাধন নামে কোনো কর্মকর্তা নেই বলেও জানান তিনি। ধামরাই থানার এসআই আরাধন চন্দ্র সাহা এ ঘটনায় কোনো বক্তব্য দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।
আরটিভি/এমএইচজে/এসআর





