মনপুরায় জেলে পরিচয়ে পণ্য পাচার ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ

চরফ্যাশন (ভোলা) প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬ , ১২:৫৫ পিএম


মনপুরায় জেলে পরিচয়ে পণ্য পাচার ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ
মনপুরা ট্রলারঘাট : ছবি আরটিভি

ভোলার মনপুরা উপজেলা থেকে মাছধরা ট্রলারযোগে পাশবর্তী দেশ মিয়ানমারে নিয়মিত পাচার হচ্ছে জ্বালানি তেল, নির্মাণসামগ্রী ও চাল-ডালের মতো নানা পণ্য। অন্যদিকে আমদানি করা হচ্ছে মাদক। এ চক্রের সক্রিয় চার সদস্য হলেন- শরিফ ছেরাং, মালেক মাঝি, নুরনবী মাঝি ও খলিল মাঝি। জেলে পরিচয়ে তারা কৌশলে চালিয়ে যাচ্ছেন এই পাচার কার্যক্রম। 

শরিফ ছেরাং ও মালেক মাঝি মনপুরা উপজেলার দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। একই ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে নুরনবী মাঝি এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা খলিল মাঝি। 

অভিযোগ রয়েছে তারা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে প্রতিটি ট্রলারবোঝাই পণ্য মিয়ানমারে খালাস করেন। এতে কারবারীরা প্রতি ট্রিপে পান দশ লাখ টাকা। ফেরার পথে মিয়ানমার থেকে মনপুরায় কোটি টাকার মাদকের চালান নিয়ে আসেন। পরে ওই মাদক তিনগুণ দামে স্থানীয় মাদকের ডিলারদের কাছে পৌঁছে দেন। 

আরও পড়ুন

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মালেক মাঝি তার ছেলে শামীমের দোকানের নামে ইস্যুকৃত ট্রেডলাইসেন্স দেখিয়ে নোয়াখালীর হাতিয়া থেকে জ্বালানি তেল, ভোগ্যপণ্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয় করেন। পরে তিনি তার নৌকাযোগে মনপুরার সূর্যমুখী মৎস্যঘাটের শামীম স্টোরে মজুত রাখেন এবং সুযোগ বুঝে গোপনে নিঝুম দ্বীপের পূর্ব পাশে অবস্থিত ‘দমার চর’-এ নিয়ে যান। এ চরটি নোয়াখালির হাতিয়া উপজেলার একটি অংশ। ওই চরে আগে থেকেই অবস্থান করা শরিফ ছেরাং, নুরনবী মাঝি ও খলিল মাঝির পাঁচটি সমুদ্রগামী মাছধরা ট্রলারে এসব পণ্য তুলে দেন। পণ্যবোঝাই শেষে শরিফ ছেরাং, নুরনবী মাঝি ও খলিল মাঝি তাদের ট্রলারগুলো নিয়ে মিয়ানমারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন। 

নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, মনপুরা থেকে সর্ব প্রথম পণ্য পাচারের কার্যক্রম শুরু করেছেন খলিল মাঝি, নুরনবী মাঝি, মালেক মাঝি ও শরিফ ছেরাং। তারা গত দু’মাস ধরে সমুদ্রে মাছ শিকারের বেশভূষায় মনপুরার কয়েকটি মৎস্যঘাট থেকে সমুদ্রের বিভিন্ন চ্যানেল ব্যবহার করে অবৈধভাবে নিত্যপণ্য ও জ্বালানি-ভোজ্য তেল পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে পাচার করছে। তাদের মতো পাচারকারী চক্রের আরও তিন ডজন সক্রিয় সদস্য মনপুরা ও চরফ্যাশনের রয়েছে। 

মনপুরার স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের পর সে দেশে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য, জ্বালানি ও ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। বাংলাদেশের সঙ্গে দামের বড় পার্থক্যের কারণে অতিমুনাফা লাভের আশায় অবৈধ এই কার্যক্রম চালাচ্ছে পাচারকারী চক্র। 

নাম প্রকাশ না করা শর্তে দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের এক জেলে বলেন, মালেক মাঝি তার ছেলের দোকানের নামে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য, জ্বালানি-ভোজ্য তেল, কোমল পানীয় নোয়াখালীর হাতিয়া থেকে পাইকারী কিনে আনেন। এসব মালামাল দোকানে বিক্রি না করে দ্বিগুন দামে শরিফ ছেরাং, খলিল মাঝি ও নুরনবী মাঝির সমুদ্রগামী মাছধরা ট্রলারে পাচার করার জন্য তুলে দেন। এভাবেই শরিফ ছেরাং গত দুই মাসে নয়টি, খলিল মাঝি ত্রিশটি, নুরনবী মাঝি ষোলটি ট্রিপ সম্পন্ন করেছেন। কালকিনি চর থকে মিয়ানমার যাওয়ার যে সামুদ্রিক চ্যানেল রয়েছে, তাতে কোস্টগার্ডের টহল সীমিত থাকায় তারা এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। 

এদিকে বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) রাত আনুমানিক ১টায় নোয়াখালীর হাতিয়া থানাধীন চর আতাউর সংলগ্ন মেঘনা নদী থেকে মনপুরার নুরনবী মাঝি ও পাচার চক্রের আরও এক সদস্য কাশেম শিকদারের দুইটি পণ্যবোঝাই ট্রলার আটক করেছে হাতিয়া কোস্টগার্ড স্টেশন। ওইসময় তাদের ট্রলারে থাকা বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের পাশাপাশি প্রায় ৫ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা মূল্যের ৭৬০ বস্তা আলু জব্দ করা হয়েছিল। কোস্টগার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে নুরনবী মাঝি ও কাশেম শিকদারসহ তাদের সহযোগীরা পালিয়ে যান। 

এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন, কোস্টগার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন। 

আরও পড়ুন

পণ্য পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করে মালেক মাঝি বলেন, আমার বোটে কোন মালামাল আসে না। আমার ছেলের দোকানের মালামাল আলাউদ্দিন মাঝির বোটে আসে। শরিফ ছেরাং, খলিল মাঝি ও নুরনবী মাঝির সাথে আমার কোন যোগসূত্র নেই। 

পাচার কার্যক্রমটি মনপুরায় লোকমুখে আলোচনা-সমালোচনার শীর্ষে থাকায় গা-ঢাকা দিয়েছেন শরিফ ছেরাং, খলিল মাঝি ও নুরনবী মাঝি। এ কারণে তাদের কাউকেই বাড়িতে পাওয়া যায়নি। তবে শরিফ ছেরাং ও খলিল মাঝির ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরটি বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। অপরদিকে নুরনবী মাঝির ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। 

হাতিয়া কোস্টগার্ড কন্টিনজেন্ট কমান্ডার মুঠোফোনে বলেন, ইতোমধ্যে মনপুরা ও হাতিয়ার পাচারকারী চক্রের কয়েকটি ট্রলার আটকসহ মালামাল জব্দ করা হয়েছে। সমুদ্রের বিভিন্ন চ্যানেলে নিয়মিত টহল অব্যাহত রয়েছে। 

মনপুরা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ফরিদুল ইসলাম জানান, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে মনপুরার যেসব জেলে বাংলাদেশী পণ্য পাশবর্তী দেশ মিয়ানমারে পৌঁছে দেয়, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহ কাওছার বলেন, বিষয়টি ইতোমধ্যে জেনেছি। যেহেতু এটা নৌপথ, এখানে নৌবাহিনী ও কোস্টগাড এর নজরদারী থাকলে এই চক্রটির পাচার কার্যক্রম বন্ধ  হবে। যদি মনপুরার কোন জেলে জড়িত থাকার প্রমাণ মেলে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।

আরটিভি/এমএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission