দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনের অন্যতম জেলা রাজবাড়ী। সারা দেশের এক-তৃতীয়াংশ পেঁয়াজ উৎপন্ন হয় এ জেলায়। তবে এবার পেঁয়াজের ভালো ফলনের পরও হাসি নেই কৃষকের মুখে। কারণ, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে পরিবহন খরচ অনেক বেড়েছে। এতে চাষাবাদের খরচ বাড়ায় পাট ও তিল চাষিরাও বিপাকে পড়েছেন। এ ছাড়া আগাম আউশ ধান রোপণের চারা তৈরিতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রাজবাড়ীতে প্রায় ৬ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। বাম্পার ফলন হলেও কৃষকদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। তেলের দাম বাড়ায় জমি থেকে পেঁয়াজ তোলা এবং বাজারে পৌঁছানোর পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
কালুখালী উপজেলার কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, পেঁয়াজ তো ভালো হইছে, কিন্তু বাজারে নিলে ট্রাকভাড়া দিতেই অর্ধেক টাকা শেষ। ভারতীয় পেঁয়াজ যদি এই সময় বাজারে আসে, তবে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে। ৬ লাখ টন পেঁয়াজ কোথায় রাখব আর কার কাছে বিক্রি করব, সেই চিন্তায় রাতে ঘুম আসে না।
এদিকে পেঁয়াজ তোলার পরপরই এ অঞ্চলের কৃষকেরা পুরোদমে পাট ও তিল চাষে মনোনিবেশ করেন। তবে অনাবৃষ্টির কারণে এবার শুরুতেই সেচ দিতে হচ্ছে। ডিজেলচালিত সেচপাম্পের খরচ গত বছরের তুলনায় বিঘাপ্রতি প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেড়ে গেছে।
এ ছাড়া সামনে আগাম আউশ ধান রোপণের মৌসুম। রাজবাড়ীর অধিকাংশ কৃষক বৃষ্টির ওপর নির্ভর করলেও চারা রোপণ ও প্রাথমিক সেচের জন্য ডিজেলচালিত যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানি তেলের বর্তমান বাজারদরে আউশ আবাদ করলে লাভের মুখ দেখা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন অনেক চাষি।
সদর উপজেলা চাষি কল্যাণ সমিতির সভাপতি সামসুল ইসলাম ও সুলতানপুর এলাকার কৃষক সাজাহান ফকির বলেন, সবকিছুর দাম বাড়তি। সার, বিষ আর শ্রমিকের দাম তো আছেই, তার ওপর তেলের দাম বাড়ায় এখন সেচ দিতে গিয়ে পকেট ফাঁকা হয়ে যাবে। এভাবে চাষ করলে ফসল বিক্রি করে চাষের খরচও উঠবে না।
বালিয়াকান্দির আদর্শ চাষি জাকির হোসেন জানান, সেচসংকটের কারণে অনেক জমি নতুন চাষের জন্য তৈরি করতে খরচ বাড়বে। সময়মতো পানি দিতে না পারলে জমি শুকিয়ে যাবে। লোকসান দিয়ে কত দিন আবাদ করব?
পাংশা উপজেলার কলিমোহর গ্রামের চাষি বরকত হোসেন বলেন, তেলের দাম যে হারে বাড়ছে, আউশ ধান রোপণ করতে গেলে তেলের দাম দিতেই মূলধন শেষ হয়ে যাবে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলায় পেঁয়াজের বিশাল মজুত থাকলেও পর্যাপ্ত হিমাগার না থাকায় কৃষকেরা তড়িঘড়ি করে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ওপর জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ ও পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে, যা সরাসরি কৃষকের লভ্যাংশে আঘাত হানছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, অন্যান্য ফসলে খুব একটা প্রভাব না পড়লেও পেঁয়াজ বাজারজাতকরণ নিয়ে বিপাকে পড়বেন কৃষকেরা।
জানতে চাইলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, এবার প্রায় ৩৬ হাজার হেক্টর জমিতে ৬ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে। এর বেশিরভাগ মাঠ থেকে উঠে গেছে। এখন বাজারজাতকরণের পালা। কিন্তু হঠাৎ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় এই পেঁয়াজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাজারগুলোতে নিতে পরিবহন খরচ বাড়বে। বিশেষ করে রাজবাড়ীর পেঁয়াজ চট্টগ্রামে বেশি যায়, সেখানে বড় ধাক্কা খাবেন কৃষকেরা। এ ছাড়া তিল ও অন্য ফসলে খুব বেশি প্রভাব না পড়লেও উৎপাদন খরচ বেড়ে যেতে পারে।
আরটিভি/টিআর




