কয়েক দিন আগেও যে শিশু বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যেত, ঘরের কোণে খেলত, সে এখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। বলছি চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামীর রউফাবাদ কলোনির শিশু রেশমীর কথা। তার বাড়িতে এখন শুধুই কান্না আর উৎকণ্ঠা ভরা।
গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাত সাড়ে নয়টার দিকে বায়েজিদ বোস্তামী থানার রউফাবাদ কলোনির শহীদ মিনার গলিতে দুই সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে শুরু হয় গোলাগুলি। এ সময় একটি গুলি লাগে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী রেশমী আক্তারের (১১) বাঁ চোখে। গুলিটি চোখ ভেদ করে তার মস্তিষ্কে ঢুকে যায়। বর্তমানে লাইফ সাপোর্টে থাকা শিশুটির অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
রোববার (১০ মে) বিকেলে চমেক হাসপাতালের আইসিইউর সামনে গিয়ে দেখা যায়, একদিকে চিকিৎসা চলছে রেশমীর, অন্যদিকে স্বজনদের আহাজারি। মা সাবেরা বেগম বারবার চোখ মুছছিলেন, আর নিশ্চুপ বসে ছিলেন বাবা রিয়াজ আহমেদ। পরিবারের সদস্যদের চোখেমুখে ভাসছে অসহায়ত্বের ছাপ। স্বজনরা এসে খোঁজ নিচ্ছেন এবং তাদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন।
জানা গেছে, রিয়াজ-সাবেরা দম্পতির দুই ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে রেশমী সবার ছোট। রেশমী স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যেত না রেশমী।
কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা সাবেরা বেগম।
তিনি জানান, ২০ টাকা হাতে দিয়ে তিনি মেয়েকে পান আনতে পাঠিয়েছিলেন। যদি জানতেন বাইরে গোলাগুলি হবে, তবে কখনোই তাকে পাঠাতেন না বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার সময় এলাকায় চার থেকে পাঁচ মিনিট ধরে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ চলে। আশপাশের লোকজন ভয়ে সরে গেলেও রেশমী নিজেকে আড়াল করতে পারেনি।
তারা বলেন, রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও সন্ত্রাসী সংঘর্ষের বলি হয়েছে শিশুটি।
রেশমীর বাবা মো. রিয়াজ আহমেদ শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। হাঁটাচলায় কষ্ট হলেও জীবিকার তাগিদে শাকসবজি বিক্রি করে পরিবার চালান তিনি। মেয়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
তিনি জানান, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু সহায়তা দেওয়া হয়েছে, তবে আইসিইউতে প্রতিদিনই বড় অঙ্কের খরচ হচ্ছে। অনেকেই দেখতে আসছেন এবং সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছেন।
রেশমীর বড় ভাই মোহাম্মদ এজাজ জানান, চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অবস্থার অবনতি হওয়ায় রেশমীর বাঁচার সম্ভাবনা খুবই কম।
চিকিৎসকরা জানান, গুলিটি রেশমীর বাঁ চোখ ভেদ করে মাথার ভেতরে ঢুকে মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশে আটকে আছে। অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় এখনো অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়নি এবং তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
খবর পেয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক রেশমীর খোঁজখবর নেন এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক ২৫ হাজার টাকা সহায়তা দেন বলে জানান তার বাবা। গত শনিবার (৯ মে) সকালে রেশমীর চিকিৎসা নিয়ে চমেক হাসপাতালে একটি উচ্চপর্যায়ের মেডিকেল বোর্ড বসে।
পরে চিকিৎসকেরা জানান, মাথায় আটকে থাকা গুলি এখনই বের করা সম্ভব নয়।
চমেক হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক সাইফুল আলম বলেন, রোগীর অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। এই অবস্থায় অস্ত্রোপচার করলে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণের ঝুঁকি রয়েছে, যা মৃত্যুঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাতে বায়েজিদ বোস্তামী থানার রউফাবাদ শহীদনগর এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে রাজু নামের এক যুবককে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয় রেশমীও।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সূত্রপাত ২৬ এপ্রিল রাউজানের কদলপুর এলাকায় নাসির উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যার মধ্য দিয়ে। ওই ঘটনায় নিহত নাসিরের মেয়ে লাভলী আক্তার হাসান রাজুর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। নাসির প্রবাসফেরত ও যুবদলের কর্মী ছিলেন। পরে তার সহযোগীরা কয়েকজন সন্ত্রাসীকে সঙ্গে নিয়ে রাজুকে হত্যার উদ্দেশ্যে নগরে আসে বলে জানা যায়। তাদের ছোড়া গুলিতেই গুলিবিদ্ধ হয় রেশমী।
এই ঘটনায় রাউজানের কদলপুর ইউনিয়নের মোহাম্মদ হাসান ওরফে রাজুর মা সখিনা বেগম শনিবার বায়েজিদ বোস্তামী থানায় অজ্ঞাতনামা আট থেকে নয়জনকে আসামি করে মামলা করেছেন।
আরটিভি/এমএম



