অভিমানে ঘর ছেড়েছিলেন, ফিরলেন ৩৮ বছর পর 

বাসস

মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬ , ০১:২০ পিএম


অভিমানে ঘর ছেড়েছিলেন, ফিরলেন ৩৮ বছর পর 
৩৮ বছর আগে অভিমান করে ঘর ছেড়েছিলেন জবেদ আলী (৬৬)। ছবি: বাসস

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বামন্দি গ্রামে এখন শুধুই আনন্দ, কান্না আর বিস্ময়ের আবহ। ৩৮ বছর আগে যে মানুষটি সামান্য অভিমান করে ঘর ছেড়েছিলেন, তাকে ঘিরে একসময় সব আশাই শেষ হয়ে গিয়েছিল স্বজনদের। ধরে নেওয়া হয়েছিল তিনি হয়তো আর পৃথিবীতেই নেই। তবে সময়ের সব হিসাবকে ভুল প্রমাণ করে সোমবার(১ জুন) বিকেলে সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষটিই ফিরে এসেছেন নিজের জন্মভিটায়।

ফিরে আসা এই প্রবীণ ব্যক্তিটির নাম জবেদ আলী (৬৬)। তিনি বামন্দি গ্রামের মৃত তোফাজ্জল মণ্ডলের ছেলে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সোমবার বিকেলে গ্রামের পথ ধরে এক বৃদ্ধ মানুষকে ধীরে ধীরে হেঁটে আসতে দেখা যায়। বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীর, মুখে সময়ের গভীর ছাপ। প্রথমে কেউ চিনতে না পারলেও বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতেই ঘটে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। দীর্ঘদিনের অপেক্ষায় ক্লান্ত স্ত্রী রুশিয়া খাতুন প্রথমে হতভম্ব হয়ে যান। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর চিনতে পারেন সেই চেনা মুখ। এরপরই চিৎকার করে ওঠেন, ‘ওই তো আমার মানুষ!’

তার সেই চিৎকার শুনে ছুটে আসেন পরিবারের অন্য সদস্য ও প্রতিবেশীরা। মুহূর্তেই কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে বাড়ির আঙিনা। কেউ তার হাত ধরে কাঁদছেন, কেউবা বুকে জড়িয়ে ধরে হারিয়ে যাওয়া দীর্ঘ সময়কে ফিরে পাওয়ার আকুল চেষ্টা করছেন।

আরও পড়ুন

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে পারিবারিক কলহের জেরে অভিমান করে চার বছরের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম ও স্ত্রী রুশিয়া খাতুনকে রেখে হঠাৎ বাড়ি ছাড়েন জবেদ আলী। এরপর বছরের পর বছর সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ করেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। কখনো দেশের অন্য প্রান্তে থাকার খবর, আবার কখনো তার মৃত্যুর গুজব এসেছে স্বজনদের কাছে। প্রতিটি খবরের পেছনে ছুটেছেন স্বজনরা, কিন্তু প্রতিবারই ফিরে এসেছে শুধু হতাশা।

দীর্ঘ এই অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকতে থাকতেই একসময় পৃথিবী ছেড়ে চলে যান জবেদ আলীর মা ও দাদি। জবেদ আলীর স্ত্রী রুশিয়া খাতুন আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘প্রথম কয়েক বছর প্রতিদিন মনে হতো, আজ হয়তো ফিরে আসবে। মানুষ বলতে শুরু করেছিল সে আর বেঁচে নেই, কিন্তু আমার মন তা মানেনি। আজ যখন সামনে দেখলাম, মনে হলো আল্লাহ আমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন।’ 

তিনি আরও জানান, চার বছরের সেই শিশু ছেলে জাহাঙ্গীর এখন প্রবাসী। বাবার ফেরার খবর শুনে সে বিদেশ থেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েছে এবং দ্রুত দেশে ফিরে বাবাকে জড়িয়ে ধরার অপেক্ষা করছে।

গ্রামের প্রবীণরা জানান, জবেদ আলী যুবক বয়সে শুধু একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন না, এলাকায় লাঠিখেলায় তার দারুণ সুনাম ছিল। এ ছাড়া যাত্রাপালার মঞ্চে তার অভিনয় দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসত। 

জবেদ আলীর চাচাতো ভাই বক্কার আলী বলেন, ‘জবেদ ভাইয়ের হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা আমাদের গ্রামের ইতিহাসের অংশ হয়ে গিয়েছিল। নতুন প্রজন্ম শুধু তার গল্প শুনেছে। আজ সেই গল্পের মানুষটিকে বাস্তবে সামনে দেখে সবাই বিস্মিত।’

নিজের জীবনের দীর্ঘ অনুপস্থিতি ও ভবঘুরে জীবনের কথা বলতে গিয়ে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি জবেদ আলীও। তিনি বলেন, ‘অভিমান করেই চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু যত দূরেই গেছি, পরিবারের কথা ভুলতে পারিনি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিনমজুর ও শ্রমিকের কাজ করেছি। মানুষের ভিড়ে থেকেও আমি ভীষণ একা ছিলাম। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি, সংসারের ভালোবাসার কোনো বিকল্প নেই। তাই শেষ বয়সে সব অভিমান মুছে নিজের মানুষের কাছে ফিরে এলাম।’

আরটিভি/এআর 

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission