ফেসবুক ভিডিওতে মিলল খোঁজ, ৪৫ বছর পর স্বজনদের কাছে ফিরলেন বৃদ্ধ

আরটিভি নিউজ

মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬ , ০৮:৪৫ পিএম


ফেসবুক ভিডিওতে মিলল খোঁজ, ৪৫ বছর পর স্বজনদের কাছে ফিরলেন বৃদ্ধ
ইসাক মিয়া। ছবি: সংগৃহীত

ইসাক মিয়ার বয়স প্রায় ৭০ বছর। সাত ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবচেয়ে ছোট। বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে আশির দশকে তিনি দুই বিঘা কৃষিজমি ও ৪০ শতাংশ বসতভিটা ৭৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে সিলেটে যান। কিন্তু সেখানে এক দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে বিদেশ যাওয়া হয়নি তার। সহায়-সম্বল হারিয়ে তাঁর বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যায়। মানসিক চাপে এরপর আর বাড়ি ফেরা হয়নি। জীবনের প্রায় ৪৫ বছর তিনি পথে-ঘাটে, বাজারে ও স্টেশনে কাটিয়ে দিয়েছেন। দালালের প্রতারণায় তিনি হারিয়েছেন পরিবার, অর্থসম্পদ ও স্বাভাবিক জীবন। বর্তমানে ইসাক মিয়া মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

তবে জীবনের শেষ প্রান্তে স্বজনদের কাছে ফিরছেন ইসাক মিয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে সন্ধান পেয়ে মঙ্গলবার সকালে কুষ্টিয়ার কুমারখালী রেলস্টেশনে ছুটে আসেন তাঁর স্বজনেরা। দুপুরে স্বজনদের কাছে তাঁকে হস্তান্তর করে উপজেলা প্রশাসন। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার, কুমারখালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আমিরুল ইসলাম, ইসাকের ভাগনে বাচ্চু মিয়া (৬০) ও মো. সাজাহান মিয়া (৬৫), ভাতিজা তাহের মিয়া (৩৫) প্রমুখ।

কুমারখালী উপজেলা প্রশাসন, স্বজন ও স্থানীয় লোকজন জানান, ইসাক মিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার বুড়িশ্বর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের মৃত সাদু মিয়ার ছোট ছেলে। আশির দশকে বিদেশ যাওয়ার জন্য জায়গাজমি বিক্রির টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি। দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরেফিরে জীবনের প্রায় ৪৫ বছর কাটিয়ে রোগে–শোকে কাতর হয়ে তিনি সম্প্রতি কুমারখালী স্টেশনে অবস্থান করছিলেন। স্থানীয় লোকজন টের পেয়ে তাঁর চিকিৎসা ও খাবারের ব্যবস্থা করেন। এরপর তাঁকে নিয়ে একটি গণমাধ্যমের ফেসবুক পেজে ভিডিও প্রকাশ করা হলে স্বজনেরা কুমারখালীতে আসেন।

মঙ্গলবার দুপুরে কুমারখালী রেলস্টেশনের বিশ্রামাগারে গিয়ে দেখা যায়, অযত্ন আর বয়সের ভারে নুয়ে পড়ছেন বৃদ্ধ ইসাক। অসুস্থ শরীর নিয়ে কখনো বসছেন চেয়ারে, কখনো মেঝেতে শুয়ে পড়ছেন। তাঁকে ঘিরে স্বজন ও স্থানীয় লোকজন আবেগাপ্লুত। কেউ কেউ আবার মুঠোফোনে ধারণ করছেন সেসব দৃশ্য। এ সময় ইসাকের ভাগনে বাচ্চু মিয়া জানান, ছোট মামা ইসাক মিয়ার লন্ডনে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল। সে জন্য ৭ ভাই–বোন মিলে প্রায় ৪৫ বছর আগে দুই বিঘা কৃষিজমি ও ৪০ শতাংশ জমিসহ বসতভিটা ৭৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছিল। সেই টাকা নিয়ে মামাবাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফিরে আসেননি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাঁকে আর পাওয়া যায়নি। তাঁর ভাষ্য, ইসাক মিয়া ছাড়া তাঁর আর কোনো ভাই–বোন বেঁচে নেই।

আরও পড়ুন

ইসাকের আরেক ভাগনে সাজাহান মিয়া বলেন, ‘সপ্তাহখানেক আগে অনলাইনে এক ভিডিওতে দেখা যায়, মামা কুমারখালী স্টেশনে। তিনি (ইসাক) গ্রামের নাম ও নানা–মামাদের নাম বলছেন। পরে স্থানীয় সাংবাদিক মনোয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করে আজ মামাকে নিতে এসেছি। তাঁর বাড়িতে কেউ নেই। আমরাই তাঁর চিকিৎসা করাব। যত দিন বাঁচে, আদর–যত্ন করব। মামাকে পেয়ে সবাই খুশি।’

ইসাকের ভাতিজা তাহের মিয়া বলেন, ‘ফেসবুকে একটি পত্রিকার ভিডিও দেখে চাচাকে খুঁজে পেয়েছি। বাবার মুখে চাচার অনেক গল্প শুনতাম। এত দিন পরে চাচাকে ফিরে পাব, তা কল্পনাও করিনি। বাবা বেঁচে থাকলে অনেক খুশি হতো। মিডিয়া আর ফেসবুকের কল্যাণে চাচাকে ফিরে পাওয়া গেছে।’

স্থানীয় ব্যবসায়ী আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ২৬ দিন আগে স্টেশনের পাশে অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিলেন ইসাক। প্রথমে সবাই ভেবেছিলেন মৃত। পরে উদ্ধার করে চিকিৎসা ও খাবার দেওয়ার পর অল্প অল্প করে কথা বলা শুরু করেন। এরপর তাঁকে নিয়ে খবর প্রকাশ হলে তাঁর ভাগনে ও ভাতিজা আজ নিতে এসেছে। স্বজনদের কাছে তাঁকে ফিরিয়ে দিতে পেরে সবাই খুশি।

বয়সের ভার, শারীরিক অসুস্থতা আর মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছেন না ইসাক মিয়া। ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘বিদেশ যাওয়ার লাইগা জাগাজমি সব সম্পত্তি বেইচা দিয়া সিলেট গিছলাম। দালালে টেহা মাইরা দিছে। পাগলের মতো পথে পথে ঘুরছি। আজ ভাগনে নিতে আইছে। বাড়ি যামু। ভালো লাগছে।’

ইউএনও ফারজানা আখতার বলেন, গণমাধ্যমের কল্যাণে প্রায় ৪৫ বছর পথে পথে ঘুরে বেড়ানোর পর ইসাক মিয়া বাড়ি ফিরছেন। যাচাই-বাছাইয়ের পর তাঁকে তাঁর দুই ভাগনেসহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

আরটিভি/ এসকেডি

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission