ঢাকা মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

যমুনার তীরে নদীভাঙন মানুষের এক ব্যতিক্রমী বিশ্বকাপ উদযাপন

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত

যমুনায় হারিয়ে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো মাতল ঢালারচরের ফুটবল মাঠ। শেষ বাঁশিটি শুধু একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচের সমাপ্তি ঘোষণা করেনি; বিদায় জানিয়েছে এমন একটি মাঠকে, যা আর কয়েক সপ্তাহ পরই যমুনার গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।

শুক্রবার (৩ জুলাই) পাবনার আমিনপুরের ঢালারচরের বালুচরে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্বপ্নগ্রাম ব্রাজিল’ ও ‘স্বপ্নগ্রাম আর্জেন্টিনা’র মধ্যকার শেষ প্রীতি ফুটবল ম্যাচ। ‘চর বয়েজ’ নামে পরিচিত স্থানীয় তরুণ ফুটবলাররা এতে অংশ নেন। নদীভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা একটি জনপদের মানুষকে সম্মান জানাতে এই ব্যতিক্রমী আয়োজন করে বিকে ফাউন্ডেশন।

বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা এখন সারা বিশ্বে। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার লড়াই দেখতে টিভি পর্দায় চোখ রাখে কোটি কোটি মানুষ। কিন্তু ঢালারচরের মানুষগুলো ফুটবল উন্মাদনাকে বরণ করে নিয়েছে অন্য একভাবে। তাদের ছোট ছোট নৌকা আর টিনের ঘরের চালায় উড়ছে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকা। জেলেরা যখন নদীতে জাল ফেলছে, তখন তাদের নৌকার মাস্তুলে দোল খাচ্ছে সেই পতাকা। ঘরের স্ত্রীরা রান্নাঘরের কাজ করতে করতেও যেন এক পলক দেখে নিচ্ছে সেই পতাকার দিকে—বিশ্বকাপের স্বপ্ন তাদেরও। কিন্তু এই স্বপ্ন তারা দেখছে এক অনিশ্চিত জীবনের মাঝে। নদী যাদের সবকিছু কেড়ে নিতে পারে, তারা অন্তত আজকের এই খেলাটি দেখবে। বিশ্বকাপের সেই উন্মাদনা হয়তো তাদের ঘরে পৌঁছায় না, কিন্তু আজ তারা সেই উন্মাদনাকে নিজেদের করে নিয়েছে।

ঢালারচরের মৎস্যজীবী ও কৃষক পরিবারগুলোর কাছে যমুনা নদী শত্রু নয়; এটি একটি শক্তি, যার বিরুদ্ধে তারা লড়াই করা ছেড়ে দিয়েছে। বছর বছর ধরে এই শক্তিশালী নদী তাদের বসতবাড়ি গ্রাস করে নিচ্ছে, তাদের ফসল ও জমি কেড়ে নিচ্ছে। তারা দেখেছে প্রতিবেশীরা কীভাবে নিজেদের সবকিছু গুছিয়ে ভেতরের দিকে সরে গেছে। একমাত্র পরিচিত ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে গেছে তারা। এখন আর কোনো রাগ নেই, শুধু ক্লান্তিকর এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি।

ম্যাচ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত তরুণ জেলে ও ফুটবলার শাহিন বলেন, ‘এটাই আমাদের জীবন। নদী নেয়, আমরা সরে যাই। সবসময়ই এমন হয়েছে। এখন আর কাঁদি না, প্রশ্নও করি না। যা বাঁচানো যায়, তা নিয়ে নতুন জায়গায় চলে যাই। কিন্তু প্রতিবারই ভেতর থেকে একটু একটু করে মরে যাই। আমাদের শিশুরা বড় হচ্ছে এই জেনে যে, আগামী বছর হয়তো তাদের এই খেলার মাঠটিও থাকবে না। এটা কেমন শৈশব?’

বহু বছর ধরে এই মাঠে অসংখ্য প্রীতি ম্যাচ হয়েছে। কিন্তু এখন স্থানীয়দের ধারণা, আর দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই যমুনা পুরো মাঠটি গ্রাস করবে। তাদের কাছে এটি নতুন কিছু নয়; নদীভাঙনের দীর্ঘ ইতিহাসে এটি আরেকটি পূর্বনির্ধারিত অধ্যায় মাত্র। বহু পরিবার ইতোমধ্যে একাধিকবার ঘরবাড়ি বদলেছে। শুধু বসতভিটাই নয়, ছেড়ে যেতে হয়েছে স্কুল, মসজিদ, এমনকি পূর্বপুরুষদের কবরও।

আরও পড়ুন

এই নীরব বেদনার মধ্যেই এক বিকেলের জন্য ফুটবল হয়ে উঠেছিল বেঁচে থাকার আনন্দ। সেদিন জেলেদের জাল গুটিয়ে রাখা হয়েছিল, মাঠে পড়ে ছিল লাঙ্গল, আর চরের শিশুরা নিজেদের কল্পনায় হয়ে উঠেছিল তারকা ফুটবলার।

তাদের একজন ১০ বছর বয়সী রাজু। শ্রেণিকক্ষে নয়; বাবার সঙ্গে মাছ ধরতে নদীতে সময় কাটে তার। চরাঞ্চলের অনেক শিশুর মতো তার কাছেও নিয়মিত শিক্ষা অধরা। স্বপ্ন নয়, নদীর অনিশ্চয়তাই নির্ধারণ করে তাদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

রাজু বলে, ‘এরকম খেলার সুযোগ আমরা কখনও পাই না। বেশিরভাগ সময় বাবার সঙ্গে নৌকায় থাকি, জাল ফেলি। স্কুলে গিয়েছি মাত্র কয়েকবার। বাবা বলেন, আবার যদি ভিটা ছেড়ে চলে যেতেই হয়, তাহলে স্কুলে যাওয়ার কী মানে? কিন্তু গতকাল সব ভুলে গিয়েছিলাম। আমি আর্জেন্টিনার হয়ে খেলেছি, একটা গোলও করেছি। কিছু সময়ের জন্য আমি আর জেলের ছেলে ছিলাম না, আমি ছিলাম একজন চ্যাম্পিয়ন।’

শাহিন এমন একটি সম্প্রদায়ের পক্ষে কথা বললেন, যারা এই সুন্দর খেলায় ক্ষণিকের সান্ত্বনা খুঁজে পায়।

তিনি বলেন, ‘আমরা ভেতরে ভেতরে ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছি। নদী আমাদের জমি, ঘর, আশা—সব কেড়ে নিচ্ছে। কিন্তু ওই নব্বই মিনিট আমরা সত্যিই বেঁচে ছিলাম। আমরা হেসেছি, উল্লাস করেছি, ভুলে গিয়েছিলাম যে নদী অপেক্ষা করছে। মাঠটা যখন আর থাকবে না, তখন আমাদের শিশুরা কোথায় খেলবে? নদী তার পরোয়া করে না। কিন্তু এই একটি স্মৃতি আমরা বয়ে নিয়ে যাব—একটি দিন, যেদিন আমরা শুধু টিকে থাকার জন্য লড়িনি, মানুষ হিসেবেও বেঁচেছিলাম।’

আরটিভি/ এসকেডি

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
চার মাস ধরে ছাত্রকে বলাৎকার, প্রধান শিক্ষককে বেধড়ক পিটুনি
সিলেটের গোলাপগঞ্জে এক ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
চার মাস ধরে ছাত্রকে বলাৎকার, প্রধান শিক্ষককে বেধড়ক পিটুনি
চুল কাটতে বলায় পরীক্ষার হলে কলম দিয়ে শিক্ষককে রক্তাক্ত করল ছাত্র
চট্টগ্রামের রাউজানে পরীক্ষার হলে চুল লম্বা রাখার কারণ জানতে চেয়ে শাসন করায় এক শিক্ষককে কলম দিয়ে একাধিক আঘাত করে রক্তাক্ত করেছে নবম শ্রেণির এক ছাত্র। আহত শিক্ষককে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁর মাথায় সেলাই দিতে হয়।
চুল কাটতে বলায় পরীক্ষার হলে কলম দিয়ে শিক্ষককে রক্তাক্ত করল ছাত্র
বাছুরের খড় খাওয়া নিয়ে বিরোধ, প্রাণ গেল একজনের
নওগাঁর মান্দায় বাছুরের খড় খাওয়া নিয়ে বিরোধের জেরে শহিদুল ইসলাম (৪২) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় তার ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম ও স্ত্রী সাথী আক্তার আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে সাইফুল ইসলামের মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে বলে জানা গেছে।
বাছুরের খড় খাওয়া নিয়ে বিরোধ, প্রাণ গেল একজনের
সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড়, কে এই ‘বাংলার কৃষ’
দিনে জীবিকার তাগিদে কাজ করেন এসএস পাইপ মিস্ত্রি হিসেবে। আর অবসর পেলেই মেতে ওঠেন সুপারহিরো হওয়ার স্বপ্ন পূরণের সাধনায়। বোনের পুরোনো বোরকাকে কৃষের পোশাকে রূপ দিয়ে নানা কসরত ও স্টান্ট দেখানোর চেষ্টা করেন তিনি।
সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড়, কে এই ‘বাংলার কৃষ’
ঘরের দরজা খুলে বাবা দেখলেন দুই মেয়ে আর নেই
ময়মনসিংহের ভালুকায় বসতঘরে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দুই সহোদর বোনের মৃত্যু হয়েছে। 
ঘরের দরজা খুলে বাবা দেখলেন দুই মেয়ে আর নেই
আরও পড়ুন
বর্ষা শেষ, তবুও থামেনি পদ্মার ভাঙন
নড়াইলে ৩ নদীর ভাঙনে বিলীন জনপদ, পরিদর্শনে এমপির আশ্বাস
পদ্মায় আবারও শুরু হয়েছে ভাঙন, আতঙ্কে জনসাধারণ
বিশ্বকাপের ২০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনায় ভুল স্বীকার ফিফার