ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

যমুনার তীরে নদীভাঙন মানুষের এক ব্যতিক্রমী বিশ্বকাপ উদযাপন

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত

যমুনায় হারিয়ে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো মাতল ঢালারচরের ফুটবল মাঠ। শেষ বাঁশিটি শুধু একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচের সমাপ্তি ঘোষণা করেনি; বিদায় জানিয়েছে এমন একটি মাঠকে, যা আর কয়েক সপ্তাহ পরই যমুনার গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।

শুক্রবার (৩ জুলাই) পাবনার আমিনপুরের ঢালারচরের বালুচরে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্বপ্নগ্রাম ব্রাজিল’ ও ‘স্বপ্নগ্রাম আর্জেন্টিনা’র মধ্যকার শেষ প্রীতি ফুটবল ম্যাচ। ‘চর বয়েজ’ নামে পরিচিত স্থানীয় তরুণ ফুটবলাররা এতে অংশ নেন। নদীভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা একটি জনপদের মানুষকে সম্মান জানাতে এই ব্যতিক্রমী আয়োজন করে বিকে ফাউন্ডেশন।

বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা এখন সারা বিশ্বে। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার লড়াই দেখতে টিভি পর্দায় চোখ রাখে কোটি কোটি মানুষ। কিন্তু ঢালারচরের মানুষগুলো ফুটবল উন্মাদনাকে বরণ করে নিয়েছে অন্য একভাবে। তাদের ছোট ছোট নৌকা আর টিনের ঘরের চালায় উড়ছে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকা। জেলেরা যখন নদীতে জাল ফেলছে, তখন তাদের নৌকার মাস্তুলে দোল খাচ্ছে সেই পতাকা। ঘরের স্ত্রীরা রান্নাঘরের কাজ করতে করতেও যেন এক পলক দেখে নিচ্ছে সেই পতাকার দিকে—বিশ্বকাপের স্বপ্ন তাদেরও। কিন্তু এই স্বপ্ন তারা দেখছে এক অনিশ্চিত জীবনের মাঝে। নদী যাদের সবকিছু কেড়ে নিতে পারে, তারা অন্তত আজকের এই খেলাটি দেখবে। বিশ্বকাপের সেই উন্মাদনা হয়তো তাদের ঘরে পৌঁছায় না, কিন্তু আজ তারা সেই উন্মাদনাকে নিজেদের করে নিয়েছে।

ঢালারচরের মৎস্যজীবী ও কৃষক পরিবারগুলোর কাছে যমুনা নদী শত্রু নয়; এটি একটি শক্তি, যার বিরুদ্ধে তারা লড়াই করা ছেড়ে দিয়েছে। বছর বছর ধরে এই শক্তিশালী নদী তাদের বসতবাড়ি গ্রাস করে নিচ্ছে, তাদের ফসল ও জমি কেড়ে নিচ্ছে। তারা দেখেছে প্রতিবেশীরা কীভাবে নিজেদের সবকিছু গুছিয়ে ভেতরের দিকে সরে গেছে। একমাত্র পরিচিত ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে গেছে তারা। এখন আর কোনো রাগ নেই, শুধু ক্লান্তিকর এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি।

ম্যাচ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত তরুণ জেলে ও ফুটবলার শাহিন বলেন, ‘এটাই আমাদের জীবন। নদী নেয়, আমরা সরে যাই। সবসময়ই এমন হয়েছে। এখন আর কাঁদি না, প্রশ্নও করি না। যা বাঁচানো যায়, তা নিয়ে নতুন জায়গায় চলে যাই। কিন্তু প্রতিবারই ভেতর থেকে একটু একটু করে মরে যাই। আমাদের শিশুরা বড় হচ্ছে এই জেনে যে, আগামী বছর হয়তো তাদের এই খেলার মাঠটিও থাকবে না। এটা কেমন শৈশব?’

বহু বছর ধরে এই মাঠে অসংখ্য প্রীতি ম্যাচ হয়েছে। কিন্তু এখন স্থানীয়দের ধারণা, আর দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই যমুনা পুরো মাঠটি গ্রাস করবে। তাদের কাছে এটি নতুন কিছু নয়; নদীভাঙনের দীর্ঘ ইতিহাসে এটি আরেকটি পূর্বনির্ধারিত অধ্যায় মাত্র। বহু পরিবার ইতোমধ্যে একাধিকবার ঘরবাড়ি বদলেছে। শুধু বসতভিটাই নয়, ছেড়ে যেতে হয়েছে স্কুল, মসজিদ, এমনকি পূর্বপুরুষদের কবরও।

আরও পড়ুন

এই নীরব বেদনার মধ্যেই এক বিকেলের জন্য ফুটবল হয়ে উঠেছিল বেঁচে থাকার আনন্দ। সেদিন জেলেদের জাল গুটিয়ে রাখা হয়েছিল, মাঠে পড়ে ছিল লাঙ্গল, আর চরের শিশুরা নিজেদের কল্পনায় হয়ে উঠেছিল তারকা ফুটবলার।

তাদের একজন ১০ বছর বয়সী রাজু। শ্রেণিকক্ষে নয়; বাবার সঙ্গে মাছ ধরতে নদীতে সময় কাটে তার। চরাঞ্চলের অনেক শিশুর মতো তার কাছেও নিয়মিত শিক্ষা অধরা। স্বপ্ন নয়, নদীর অনিশ্চয়তাই নির্ধারণ করে তাদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

রাজু বলে, ‘এরকম খেলার সুযোগ আমরা কখনও পাই না। বেশিরভাগ সময় বাবার সঙ্গে নৌকায় থাকি, জাল ফেলি। স্কুলে গিয়েছি মাত্র কয়েকবার। বাবা বলেন, আবার যদি ভিটা ছেড়ে চলে যেতেই হয়, তাহলে স্কুলে যাওয়ার কী মানে? কিন্তু গতকাল সব ভুলে গিয়েছিলাম। আমি আর্জেন্টিনার হয়ে খেলেছি, একটা গোলও করেছি। কিছু সময়ের জন্য আমি আর জেলের ছেলে ছিলাম না, আমি ছিলাম একজন চ্যাম্পিয়ন।’

শাহিন এমন একটি সম্প্রদায়ের পক্ষে কথা বললেন, যারা এই সুন্দর খেলায় ক্ষণিকের সান্ত্বনা খুঁজে পায়।

তিনি বলেন, ‘আমরা ভেতরে ভেতরে ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছি। নদী আমাদের জমি, ঘর, আশা—সব কেড়ে নিচ্ছে। কিন্তু ওই নব্বই মিনিট আমরা সত্যিই বেঁচে ছিলাম। আমরা হেসেছি, উল্লাস করেছি, ভুলে গিয়েছিলাম যে নদী অপেক্ষা করছে। মাঠটা যখন আর থাকবে না, তখন আমাদের শিশুরা কোথায় খেলবে? নদী তার পরোয়া করে না। কিন্তু এই একটি স্মৃতি আমরা বয়ে নিয়ে যাব—একটি দিন, যেদিন আমরা শুধু টিকে থাকার জন্য লড়িনি, মানুষ হিসেবেও বেঁচেছিলাম।’

আরটিভি/ এসকেডি

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
হাতিয়ায় সাড়ে ৩ কেজির ইলিশ ১০ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় ৩ কেজি ৭০০ গ্রাম ওজনের একটি বড় ইলিশ মাছ ১০ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
হাতিয়ায় সাড়ে ৩ কেজির ইলিশ ১০ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি
দাউদকান্দির এই সেতু যেন ‘পুলসিরাত’
কুমিল্লার দাউদকান্দিতে দীর্ঘদিন ধরে হয়নি সংস্কার না হওয়ায় একটি সেতুর মাঝের অংশে ফাটল ধরেছে। দেবে গেছে একটি পিলারও। ভাঙা সেতু দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন চলাচল করছেন ১৬ গ্রামের হাজারো মানুষ। যেকোনো সময় সেতুটি ধসে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে শঙ্কায় রয়েছেন স্থানীয়রা।
দাউদকান্দির এই সেতু যেন ‘পুলসিরাত’
৫ ট্রান্সফরমার নিলো চোরের দল, মাশুল গুনলেন কৃষকরা
ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলায় মাত্র এক রাতের ব্যবধানে পাঁচটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটেছে। আর এই চুরির খেসারত হিসেবে রঘুনাথপুর ইউনিয়নের সব এলাকার ভুক্তভোগী সাধারণ গ্রাহক ও কৃষকদের পকেট থেকেই বিপুল অঙ্কের টাকা মাশুল আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
৫ ট্রান্সফরমার নিলো চোরের দল, মাশুল গুনলেন কৃষকরা
মাদরাসাশিক্ষকের বাসায় আরবি শিখতে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ফিরল শিশু, অতঃপর...
চাঁদপুরে চতুর্থ শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে আমিনুল ইসলাম (৬৪) নামে এক মাদরাসাশিক্ষককে আটক করেছে পুলিশ। পরে তার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করা হয়।
মাদরাসাশিক্ষকের বাসায় আরবি শিখতে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ফিরল শিশু, অতঃপর...
মাছের খাবার দেওয়ার সময় হঠাৎ বজ্রপাত, বাঁচানো গেল না আলীমকে
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বজ্রপাতে আব্দুল আলীম চৌধুরী (৫৫) নামে এক ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়েছে। 
মাছের খাবার দেওয়ার সময় হঠাৎ বজ্রপাত, বাঁচানো গেল না আলীমকে
আরও পড়ুন
বর্ষা শেষ, তবুও থামেনি পদ্মার ভাঙন
নড়াইলে ৩ নদীর ভাঙনে বিলীন জনপদ, পরিদর্শনে এমপির আশ্বাস
পদ্মায় আবারও শুরু হয়েছে ভাঙন, আতঙ্কে জনসাধারণ
বিশ্বকাপের ২০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনায় ভুল স্বীকার ফিফার