ভরা মৌসুমে ইলিশের আকাল

হাতিয়া প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬ , ০১:০২ পিএম


ভরা মৌসুমে ইলিশের আকাল
ছবি: আরটিভি

চিরচেনা ঘাটে নেই হাঁকডাক। চায়ের দোকানে নেই উচ্ছ্বসিত আড্ডা ও গান-বাজনার শব্দ। নেই বরফ ভাঙার সেই পরিচিত আওয়াজ। সবকিছু যেন থমকে আছে। জেলে, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও আড়তদার—সবার চোখেমুখে হতাশার ছাপ। ভরা মৌসুমেও ইলিশের দেখা মিলছে না। শূন্য হাতে ঘাটে ফিরছে জেলে নৌকাগুলো। এতে নোয়াখালীর হাতিয়ার ২০টি ঘাটে এ পেশার সঙ্গে জড়িত লক্ষাধিক মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

জেলেরা জানান, এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইলিশের ভরা মৌসুম। এ সময় জেলেরা পুরোপুরি ব্যস্ত সময় পার করেন ইলিশ শিকারে। প্রতি বছরের মতো এ বছরও দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার জেলেরা নদীতে মাছ শিকারে ব্যস্ত সময় পার করছেন। নিঝুমদ্বীপ, বন্দরটিলা, সুইজের ঘাট, মোক্তারিয়া, দানারদোল, সূর্যমুখী, কাজীরবাজার, বাংলাবাজার ও চেয়ারম্যানঘাটসহ দ্বীপের বড় ২০টি ঘাটের ছোট-বড় প্রায় ১০ হাজার জেলে নৌকা নদীতে বিচরণ করছে।

তবে হতাশার বিষয় হলো, জেলেদের জালে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। প্রতিদিনই শূন্য হাতে ঘাটে ফিরতে হচ্ছে তাদের। মৌসুমের বেশির ভাগ সময় পার হয়ে গেলেও এখনো লাভের মুখ দেখেননি তারা। অন্যদিকে, নদীতে যেতে প্রতিদিন যে ব্যয় হচ্ছে, তাতে আর্থিক দেনার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। অনেকে পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতেও হিমশিম খাচ্ছেন। ঘাটগুলোতে নেই আগের সেই হাঁকডাক, দেখা দিয়েছে নীরবতা ও হতাশা।

উপজেলার সূর্যমুখী ঘাটে দেখা হয় এক বৃদ্ধ জেলের সঙ্গে। মুখভর্তি দাড়ি, বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি। মলিন চেহারা নিয়ে খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। কথা হলে আব্দুল আলী নামে ওই জেলে জানান, তার বাড়ি পাশের জেলা ভোলার দৌলতখা উপজেলায়। ভালো মাছ পাওয়ার আশায় হাতিয়ায় এসে মাছ শিকার করছেন। মৌসুমের শুরু থেকেই তিনি এখানে অবস্থান করছেন। তার সঙ্গে থাকা ট্রলারের ১০ মাঝি-মাল্লার বাড়িও একই এলাকায়।

উপার্জনের বিষয়ে জানতে চাইলে অনেকটা কান্নাজড়িত কণ্ঠে আব্দুল আলী বলেন, “এ বছর অবস্থা খুবই নাজুক। দেড় মাস আগে এসেছি। এখনো উপার্জন করে এক টাকাও বাড়িতে পাঠাতে পারিনি। খেয়ে না খেয়ে চলছে পাঁচ সদস্যের সংসার। মাঝে মধ্যে মোবাইলে কথা বললে পরিবারের সদস্যরা টাকা পাঠাতে বলেন। কিন্তু কিছুই করার নেই।”

তিনি আরও জানান, গত দেড় মাসে তাদের নৌকাটি বেশ কিছু টাকা দেনাগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিদিন নদীতে গেলে জ্বালানি খরচ ও নিজেদের খাবারের খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হয়।

কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ায় ঘাটগুলোতে নেই আগের সেই কর্মচাঞ্চল্য। কর্মব্যস্ততার চিরচেনা ঘাটে এখন হতাশার ছাপ। অনেক ব্যবসায়ী তাদের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে পারছেন না। ঘাট শ্রমিকদের সংসার চলছে জোড়াতালি দিয়ে। অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন।

সূর্যমুখী ঘাটে জেলেদের নৌকা থেকে ডাকের বাক্সে মাছ টানার জন্য প্রায় ৫০ জন শ্রমিক রয়েছেন। সরেজমিনে দেখা যায়, তাদের অনেকে নির্দিষ্ট পোশাকে টুকরি নিয়ে জেলে নৌকার অপেক্ষায় খালের পাড়ে বসে আছেন। তাদের একজন নবির সর্দার (৪৫)।

নবির সর্দার জানান, প্রতিদিন মাছ টানার পর যে টাকা পান, তা ৫০ জন শ্রমিক ভাগ করে নেন। এতে কোনো দিন ২০০ টাকা, আবার কোনো দিন তার চেয়েও কম টাকা ভাগে পান। এ আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। এজন্য অনেকে অন্য পেশায় চলে গেছেন।

তিনি আরও জানান, মৌসুমের অর্ধেক সময় পার হয়ে গেছে। এখনো পর্যাপ্ত মাছ ধরা পড়ছে না। এতে অনেক ব্যবসায়ী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বাড়ি চলে গেছেন। অনেক জেলেও নৌকা ঘাটে বেঁধে রেখেছেন।

হাতিয়া সূর্যমুখী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি জবিয়ল হক জানান, হাতিয়ায় ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার মানুষের বসবাস। এখানে জেলে পেশার সঙ্গে জড়িত প্রায় লক্ষাধিক মানুষ। নদীতে মাছ ধরা না পড়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। অনেক জেলে পরিবার অনাহারে-অর্ধাহারে জীবনযাপন করছে।

তিনি বলেন, ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরপরই হাতিয়ার ২০টি ঘাট থেকে ছোট-বড় প্রায় ১০ হাজার জেলে নৌকা নদীতে নামে। কিন্তু বর্তমানে মাছ না পাওয়ায় প্রতিটি ঘাটের প্রায় অর্ধেক নৌকা নদীতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। তারা ঘাটে বসে অলস সময় পার করছে। যারা নদীতে যাচ্ছে, তারাও প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।

তিনি আরও বলেন, সারাদিন নদীতে থেকে এসব নৌকা বিকেলে ৪-৫টি ছোট মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরছে। কিছু কিছু নৌকা তাও পাচ্ছে না। উপার্জন না থাকায় এসব জেলেরা বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেক জেলে মালিককে না জানিয়ে গোপনে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় চলে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান বলেন, ভরা মৌসুমে ইলিশ না পাওয়ার কারণ হিসেবে জাটকা নিধন, মা ইলিশ ধরা, ডুবোচর, নদীদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করা যায়। তিনি আরও বলেন, উপকূলীয় এলাকায় কলকারখানার বর্জ্য নদীতে আসায় মাছের বিচরণ অনিরাপদ হয়ে উঠছে। তবে মৌসুমের পরবর্তী সময়ে কাঙ্ক্ষিত মাছ পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

আরটিভি/টিআর

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission