হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে দেশের অন্যতম বিরল বনজ পাখি কালো মথুরা বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রীর ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। বিরল এই পাখির ছবি প্রকাশের পর প্রকৃতিপ্রেমী, পাখি গবেষক ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রখ্যাত বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী আনিস শেখ সম্প্রতি সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের গভীর অরণ্যে একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ কালো মথুরার দুর্লভ ছবি ধারণ করেন। তিনি জানান, দীর্ঘ সময় ধৈর্য ধরে বন পর্যবেক্ষণের পর উদ্যানের একটি নিরিবিলি স্থানে পাখিটির দেখা পান। সে সময় কালো মথুরাটি বনপথের পাশে খাদ্যের সন্ধানে ব্যস্ত ছিল। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে তিনি ক্যামেরায় পাখিটির কয়েকটি দুর্লভ মুহূর্ত ধারণ করতে সক্ষম হন।
আনিস শেখ বলেন, বাংলাদেশের বনাঞ্চলে এমন বিরল প্রজাতির পাখির উপস্থিতি আমাদের জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এ ধরনের প্রজাতি টিকিয়ে রাখতে বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে।
বন বিশেষজ্ঞদের মতে, কালো মথুরা বাংলাদেশের অত্যন্ত বিরল আবাসিক বনমোরগ। ঘন চিরসবুজ ও আধা-চিরসবুজ বনাঞ্চলই এদের প্রধান আবাসস্থল। মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই পাখিটি দ্রুত ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে, ফলে খালি চোখে দেখা কিংবা ছবি ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন।
প্রকৃতিবিদরা জানান, পুরুষ কালো মথুরার শরীরে চকচকে নীলাভ-কালো পালক, মাথায় উজ্জ্বল লাল রঙের খোলা ত্বক এবং লম্বা সাদা-কালো মিশ্রিত লেজ থাকে, যা সহজেই অন্য বনমোরগ থেকে আলাদা করে চেনা যায়। বনজ ফল, বীজ, কচি পাতা এবং ছোট ছোট পোকামাকড় এদের প্রধান খাদ্য।
প্রায় ২৪৩ হেক্টর আয়তনের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল। এ বনাঞ্চলে শতাধিক প্রজাতির পাখির পাশাপাশি অসংখ্য স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ ও উভচর প্রাণীর বসবাস রয়েছে। উল্লুক, মুখপোড়া হনুমান, মায়া হরিণ, বনবিড়ালসহ নানা বিরল প্রাণীর পাশাপাশি কালো মথুরার উপস্থিতি উদ্যানটির পরিবেশগত গুরুত্বকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীদের মতে, অবৈধ গাছ কাটা, বনভূমিতে মানুষের অনুপ্রবেশ, শব্দদূষণ এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে কালো মথুরার মতো বিরল প্রজাতির সংখ্যা ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে। তাই সাতছড়িসহ দেশের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নজরদারি জোরদার, দর্শনার্থীদের সচেতন করা এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল অক্ষুণ্ন রাখা এখন সময়ের দাবি।
সাতছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা মেহেদী মাসুদ বলেন, কালো মথুরার এই উপস্থিতি শুধু একটি দুর্লভ আলোকচিত্র নয়। এটি সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একই সঙ্গে এটি দেশের বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের গুরুত্ব নতুন করে তুলে ধরেছে। সাতছড়ি বনের জীববৈচিত্র্য আগের তুলনায় আরও সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় হয়েছে।
আরটিভি/এসকে




