সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকজুড়ে হঠাৎ করেই ছড়িয়ে পড়েছে ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে দূর অজানায় চায় হারাতে’ গানটি ব্যবহার করে তৈরি অসংখ্য রিল ভিডিও। বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষ নিজেদের ছবি বা ভিডিওর সঙ্গে গানটি যুক্ত করে পোস্ট করছেন। এর পেছনে রয়েছে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের এক প্রধান শিক্ষিকাকে ঘিরে ঘটে যাওয়া সাইবার বুলিংয়ের ঘটনা।
জানা গেছে, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রানী পাল সম্প্রতি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বিদ্যালয়ের আঙিনায় হাঁটার একটি রিল ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওটিতে ব্যবহৃত হয় ‘ডিফারেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের জনপ্রিয় গান ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’-এর অংশ ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে দূর অজানায় চায় হারাতে’।
পরবর্তীতে একটি ফেসবুক পেজ ভিডিওটি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে ছড়িয়ে দেয়। এরপর শুরু হয় তাকে নিয়ে ব্যাপক ট্রল ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হয় এবং কিছু ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবিও তোলেন।
এ ঘটনায় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত জানান, সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হবে।
সাইবার বুলিংয়ের মুখে ভিডিওটি সরিয়ে নেন বিউটি রানী পাল। তবে তার প্রতি সংহতি জানিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা একই গান ব্যবহার করে নিজেদের রিল ভিডিও প্রকাশ করতে শুরু করেন। পরে এই প্রতিবাদে যোগ দেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারী-পুরুষ। এভাবেই ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে’ গানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হয়।
দেশজুড়ে পাওয়া সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন বিউটি রানী পাল। তিনি বলেন, একটি স্বাভাবিক ও সুন্দর মুহূর্তের ভিডিওকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে তাকে সাইবার বুলিংয়ের শিকার করা হয়েছে। যারা তার পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা বিউটি রানী পাল ২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। চলতি বছর তিনি জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন। তার ফেসবুক পেজে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আনন্দঘন পাঠদান, শরীরচর্চা, নাচের মাধ্যমে গণিত শেখানো, বৃক্ষরোপণসহ বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্যক্রমের ভিডিও নিয়মিত প্রকাশ করা হয়।
সাইবার বুলিংয়ের ঘটনায় গত শুক্রবার ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তিনি। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ‘আসিফ ইকবাল ইরন’ নামের একটি ফেসবুক আইডি এবং ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ নামের একটি পেজ তার ভিডিওকে বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছে।
এ বিষয়ে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আজিজুন্নাহার জানান, শিক্ষিকার করা জিডির বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেখছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই বিউটি রানী পালের পাশে দাঁড়িয়ে লিখছেন, একজন শিক্ষকেরও ব্যক্তিগত জীবন রয়েছে এবং সেটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা গ্রহণযোগ্য নয়।
এদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, তিনি ভিডিওটি না দেখলেও আশপাশের মানুষের কাছ থেকে জেনেছেন সেখানে কোনো অশ্লীলতা ছিল না। তার ভাষায়, গান গাওয়া অন্যায় এটা আমি মানতে রাজি নই।
অন্যদিকে, শিক্ষকদের একটি অংশের দাবি, বিউটি রানী পালের বিরুদ্ধে তদন্তের পরিবর্তে শিক্ষা বিভাগের উচিত ছিল সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে তার পাশে দাঁড়ানো এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করা।
আরটিভি/এসকে




