গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় স্ত্রী, তিন সন্তান ও শ্যালককে হত্যার ঘটনায় ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকরা। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক ও নির্মম চিত্র। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, পাঁচজনের মধ্যে চারজনকে ধারাল অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে এবং দুই বছরের এক শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক ডা. মাজহারুল হক ময়নাতদন্ত শেষে এই ভয়াবহ বর্ণনা দেন। তিনি জানান, নিহতদের ভিসেরা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকা সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে প্রতিবেদন এলে নিশ্চিত হওয়া যাবে যে হত্যার আগে তাদের কোনো চেতনানাশক ওষুধ খাওয়ানো হয়েছিল কি না।
ডা. মাজহারুল হক বলেন, ‘নিহতদের মধ্যে রসুল মোল্লাকে গভীর ঘুমে থাকা অবস্থায় অথবা চেতনানাশক খাইয়ে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। কারণ, হত্যার সময় তিনি কোনো প্রতিরোধ করার সুযোগ পাননি। তার গলায় ধারাল অস্ত্রের দুটি গভীর ক্ষত পাওয়া গেছে।’ আর সবচেয়ে ছোট শিশু ফারিয়াকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
গত শনিবার(৯ মে) সকালে উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামের একটি বাড়ি থেকে শারমিন আক্তার, তার তিন মেয়ে মীম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮), ফারিয়া (২) এবং শারমিনের ভাই রসুল মিয়ার (২২) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর থেকেই শারমিনের স্বামী ফোরকান মিয়া পলাতক রয়েছেন। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, পারিবারিক কলহের জেরে ফোরকান একাই এই নৃসংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।
স্ত্রী, তিন সন্তানসহ পাঁচজনকে হত্যার রাতে অভিযুক্ত ফোরকান মিয়া (৪০) যেসব কাজ করেছিলেন তা তার প্রতিবেশীদের ভাষ্যে উঠে এসেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ওই দিন তার বাসায় অতিথি এসেছিল। এজন্য তিনি দোকান থেকে পোলাওয়ের চাল ও কিশমিশ কিনে আনেন। পাশের বাড়ির এক বাসিন্দা গণমাধ্যমকে জানান, ‘শুক্রবার (৮ মে) রাতে ফোরকানকে দীর্ঘ সময় বাড়ির সামনের সড়কে হাঁটতে এবং মোবাইলে কথা বলতে দেখেছি বলে লোকজনের মুখে শুনেছি। তখন তার কোলে ছিল ছোট মেয়ে ফারিয়া, আর পাশে হাত ধরে হাঁটছিল মেজ মেয়ে মারিয়া।’
অন্য এক প্রতিবেশীর ভাষ্য, রাত প্রায় ৮টার দিকে ফোরকান বাড়িতে ফেরেন। তখন তার ব্যক্তিগত গাড়ির পাশাপাশি আরও একটি প্রাইভেটকার সেখানে আসে। গাড়ি থেকে কয়েকজন ব্যক্তিকে নামতেও দেখা যায়।
এক মুদি দোকানদার জানান, শুক্রবার রাত ৯টার দিকে ফোরকান ছোট মেয়েকে কোলে নিয়ে তার দোকানে আসেন। এসে প্রথমেই জানতে চান, ‘ভাবি, কিশমিশ আছে?’ পরে মেয়ের জন্য দুটি চিপসও কেনেন। তার হাতে তখন কাপড়ের একটি ব্যাগ ছিল। দোকানদার বলেন, ‘তিনি প্রায়ই ছোট মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে দোকানে আসতেন। নিজের সন্তানকে তিনি গলা কেটে হত্যা করতে পারেন—এটা আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়।’
বাড়ির পাশের আরেক দোকানি বলেন, ‘ঘটনাটি বিশ্বাস করাই কঠিন। একজন বাবা কীভাবে নিজের সন্তানদের হত্যা করতে পারে?’ তিনি আরও জানান, শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ফোরকানকে সড়কে হাঁটতে দেখেছেন। সে সময় তার কোলে ছোট মেয়ে ছিল এবং সঙ্গে হাঁটছিল মেজ মেয়ে মারিয়া।
স্থানীয় এক নারী বলেন, শারমিন আক্তার দোষ বা ভুল করে থাকলে তাকে ছেড়ে (ডিভোর্স) দিত কিন্তু তার মেয়ে এবং শ্যালকের কী দোষ ছিল? বাবা হয়ে মেয়েদের এভাবে হত্যা করতে পারে না। এ ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে।
গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) মো. আশফাক গণমাধ্যমকে বলেন, নিহত নারীর বাবা শাহাদাত মোল্লা মামলা করেছেন। আমাদের একাধিক টিম ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন এবং আসামিকে গ্রেপ্তারে কাজ করছে। আপাতত তদন্তের স্বার্থে আর কিছু বলা যাচ্ছে না।
আরটিভি/এআর




