ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে উদ্ভূত যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে আটকা পড়েছে সাপ্তাহিক ১,০০০ টিইইউর (বিশ ফুট সমতুল্য ইউনিট) বেশি রপ্তানি পণ্য। প্রধান শিপিং লাইনগুলো বুকিং স্থগিত করায় আলু, কৃষিপণ্য, হিমায়িত খাদ্য ও তৈরি পোশাক বোঝাই কনটেইনারগুলো এখন বিভিন্ন বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডি) পড়ে রয়েছে।
এরই মধ্যে দীর্ঘ যুদ্ধের শঙ্কা তৈরি হওয়ায় ক্রমবর্ধমান স্টোরেজ খরচ ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন রপ্তানিকারকরা।
এই অচলাবস্থার প্রথম শিকার হয়েছে দুবাইগামী একটি মৌসুমি আলুর চালান। এসআর ইমপেক্স লিমিটেডের ২৮ টনের একটি চালান প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিং শেষে ১ মার্চ বগুড়া থেকে চট্টগ্রামে পৌঁছায়। পরদিন চালানটি জেবেল আলী বন্দরের উদ্দেশে জাহাজে তোলার কথা ছিল। কিন্তু কার্গোটি আর ডিপো ছেড়ে বের হতে পারেনি।
নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে শিপিং লাইনগুলো হঠাৎ মধ্যপ্রাচ্যের গন্তব্যে বুকিং নেওয়া বন্ধ করে দেওয়ায় কনটেইনারটি এখন একটি বেসরকারি আইসিডিতে পড়ে আছে।
এসআর ইমপেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ফ্রেশ ফুড অ্যান্ড ফ্রুটস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফোরকান বলেন, পণ্য লোড করার সময় হঠাৎ শিপিং লাইন থেকে জানানো হয় যে তারা আর বুকিং নেবে না। আমাদের স্লটও বাতিল করে দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, আলু যাতে নষ্ট না হয়, সেজন্য কোনোরকমে অন্য একটি ডিপো থেকে কনটেইনার জোগাড় করে সেটিতে বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা করেছি। এখন কেবল আলু সংরক্ষণের জন্যই আমাদের প্লাগিং ও ডিপো চার্জ দিতে হচ্ছে। সামনে কী হবে জানি না।
মোহাম্মদ ফোরকান বলেন, প্রতি সপ্তাহে চট্টগ্রাম বন্দর ও বিমানবন্দরের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রায় ৪৫০ টন আলু, আরও ৪৫০ টন কৃষি ও খাদ্যপণ্য এবং প্রায় ৩০০ টন হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি হয়। তৈরি পোশাক ও অন্যান্য রপ্তানিসহ এর মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৭ মিলিয়ন ডলার।
রপ্তানিকারকদের আশঙ্কা, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে। এতে বাংলাদেশের বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পের খরচ বেড়ে যাবে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট এই অচলাবস্থা দেশের বৃহত্তম রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পেও বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে।
যদিও বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির মাত্র ২ শতাংশের কিছু বেশি (প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার) মধ্যপ্রাচ্যে হয়, তবুও ঈদের কেনাকাটার মৌসুমে এই বাজারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, উৎসবের মৌসুমকে কেন্দ্র করে যখন পুরোদমে রপ্তানি শুরু হওয়ার কথা, ঠিক তখনই এই যুদ্ধ শুরু হলো। এ অবস্থায় কর্মীদের ঈদ বোনাস আর বেতন পরিশোধ করা নিয়ে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে রপ্তানিকারকদের কপালে।
নতুন উদ্ভূত এই সঙ্কট শুধু রপ্তানিতেই নয়, চাপ বাড়াচ্ছে আমদানিতেও। সমুদ্রপথে বিঘ্ন ঘটায় শিল্পের কাঁচামালের প্রধান উৎস চীন থেকে পণ্য পরিবহনের ভাড়া (ফ্রেইট রেট) বাড়তে শুরু করেছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক দিনে চীনের বন্দরগুলো থেকে কনটেইনারপ্রতি জাহাজ ভাড়া প্রায় ৩০০ ডলার বেড়েছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সনংতগঠন বিজিএমইএ-র সাবেক সহ-সভাপতি রাকিবুল আলম বলেন, জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি আমদানিকারকদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে চীন থেকে হাই-কিউব কনটেইনারে পণ্য আমদানিতে ভাড়া প্রায় ৫০০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
আরটিভি/এসএইচএম





