বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন যুগের সূচনা করবে বাংলাদেশ-জাপান ইপিএ 

বাসস

মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬ , ১০:২৭ এএম


বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন যুগের সূচনা করবে বাংলাদেশ-জাপান ইপিএ 

চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষর একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইলফলক। এটি বাংলাদেশকে ধাপে ধাপে এলডিসি পর্যায়ের বিশেষ সুবিধার ওপর নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে নিয়মভিত্তিক ও প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রবেশের পথ তৈরি করছে।

ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশের (আইসিসিবি)’র সর্বশেষ ত্রৈমাসিক বুলেটিনের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, এই চুক্তি শুধু একটি সাধারণ বাণিজ্য চুক্তি নয়, এটি একটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, যা এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করে তুলতে সহায়তা করবে।

এই চুক্তির মাধ্যমে জাপান বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্যে শুল্কমুক্ত (ডিউটি-ফ্রি) প্রবেশাধিকার দিয়েছে। এতে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৯৭ শতাংশ পণ্য অন্তর্ভুক্ত, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় খাত তৈরি পোশাকও রয়েছে।

এটি বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশটি এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। সাধারণত এলডিসি থেকে বের হলে বিভিন্ন দেশে রপ্তানির ওপর শুল্ক আরোপ হয়। কিন্তু এই চুক্তির মাধ্যমে জাপানের মতো বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতিতে বাংলাদেশ আগের মতোই সহজ শর্তে পণ্য রপ্তানি করতে পারবে। ফলে এলডিসি উত্তরণের পর রপ্তানিতে শুল্ক বেড়ে যাওয়ার যে বড় ঝুঁকিটি ছিল, বাংলাদেশ অনেকটাই তা কমাতে পেরেছে।

শুল্ক সুবিধার বাইরে, এই ইপিএ চুক্তিটি অনেক বিস্তৃত ও আধুনিক। এতে শুধু পণ্য বাণিজ্য নয়, সেবা খাত, বিনিয়োগ, কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা, মেধাস্বত্ব (ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি) এবং ডিজিটাল বাণিজ্য- এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। জাপান বাংলাদেশের জন্য ১২০টি সেবা খাত খুলে দিয়েছে, আর বাংলাদেশ জাপানের জন্য ৯৭টি খাত উন্মুক্ত করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের দক্ষ কর্মীরা, বিশেষ করে আইটি, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কেয়ারগিভিং খাতে জাপানে কাজের নতুন সুযোগ পাবে।

একইসঙ্গে এই চুক্তি বাংলাদেশে বিশেষ করে উচ্চমূল্যের উৎপাদন খাত ও প্রযুক্তি খাতে জাপানের বিনিয়োগ বাড়াতে উৎসাহ দেবে। এতে নতুন প্রযুক্তি আসবে এবং দেশের শিল্প খাত আরও উন্নত হবে। এই ইপিএ চুক্তির আরেকটি বড় গুরুত্ব হলো- এটি বহু বছর ধরে বাংলাদেশের রপ্তানির তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীলতা বদলে দিতে পারে।

আরও পড়ুন

এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন ইলেকট্রনিক্স, গাড়ির যন্ত্রাংশ (অটোমোটিভ কম্পোনেন্ট) এবং প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মতো উচ্চমূল্যের খাতে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে। এ ছাড়া এই চুক্তির মাধ্যমে অশুল্ক বাধা কমবে এবং নিয়মকানুন আরও স্বচ্ছ হবে। এতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে এবং দেশটি বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য আরও আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠবে।

ভবিষ্যতের দিকে তাকালে, বাংলাদেশ-জাপান ইপিএ চুক্তিটি একটি শক্ত উদাহরণ তৈরি করেছে। এর ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান দেশগুলো এবং যুক্তরাজ্যের মতো বড় অর্থনীতির সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্ত হবে। সরকারের নীতিনির্ধারক এবং বেসরকারি খাত- দু’পক্ষই এই চুক্তিকে ভবিষ্যতের অন্যান্য ইপিএ ও ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ)-এর জন্য একটি মডেল হিসেবে দেখছে।

এদিকে এই সময়ে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিটিও সামনে এসেছে। তবে এটি জাপানের ইপিএ’র মতো বিস্তৃত নয়, বরং কিছু শর্তযুক্ত এবং সীমিত। এই চুক্তিতে কিছু নির্দিষ্ট সুবিধা রয়েছে, যেমন-যুক্তরাষ্ট্রের তুলা বা কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার। কিন্তু এই শর্তের কারণে বাংলাদেশ ইচ্ছেমতো অন্য দেশ থেকে কাঁচামাল নিতে পারবে না। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যেতে পারে।

জাপানের ইপিএ’র মতো এখানে সেবা খাত, বিনিয়োগ বা নিয়মকানুনে সহযোগিতার বিস্তৃত সুযোগ নেই। এ ছাড়া সব ধরনের পণ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদে শুল্ক সুবিধার নিশ্চয়তাও দেয় না। আরেকটি বিষয় হলো, এই চুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত থাকায় কিছু ভূ-রাজনৈতিক চাপও তৈরি হতে পারে। তাই কিছু সুযোগ থাকলেও এই চুক্তির সীমাবদ্ধতাগুলো দেখায় যে দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি বাড়াতে বাংলাদেশের আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য চুক্তি প্রয়োজন।

সবকিছু মিলিয়ে এই উন্নয়নগুলো দেখায় যে, বাংলাদেশের বাণিজ্য কৌশলে একটি বড় পরিবর্তন আসছে। আগে যেখানে বিভিন্ন বিশেষ সুবিধার ওপর নির্ভরতা ছিল, এখন সেখানে অংশীদারিত্বভিত্তিক এবং নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক বাণিজ্যের দিকে এগোচ্ছে দেশ।

তবে এই সুযোগগুলো পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে দেশের ভেতরেই প্রস্তুতি নিতে হবে। যেমন, পণ্যের মান নিশ্চিত করার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা, পরিবহন ও বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করা, দক্ষ জনবল তৈরি করা এবং সঠিক ও সমন্বিত নীতিমালা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। এসব ঠিকভাবে করতে পারলে বাংলাদেশ এই সুযোগগুলোকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি বাড়াতে এবং শিল্পখাতে বড় পরিবর্তন আনতে পারবে।

বাংলাদেশ-জাপান ইপিএ শুধু একটি মাইলফলক নয়, এটি একটি বার্তা। এই চুক্তি দেখায় যে বাংলাদেশ এখন এলডিসি পরিচয়ের বাইরে গিয়ে একটি শক্তিশালী ও নিয়মভিত্তিক বাণিজ্য দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে প্রস্তুত। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এই চুক্তির মাধ্যমে শিল্পখাতে উন্নয়ন, রপ্তানির বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো- এই বড় সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক গতি বজায় রাখা এবং একই ধরনের চুক্তি অন্যান্য উন্নত দেশের সঙ্গে করা।

আরটিভি/আইএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission