ফ্রিল্যান্সিং-আউটসোর্সিংকে অর্থনীতির চালিকাশক্তি মনে করছে বাংলাদেশ

আরটিভি নিউজ

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬ , ০৯:০৮ পিএম


ফ্রিল্যান্সিং-আউটসোর্সিংকে অর্থনীতির চালিকাশক্তি মনে করছে বাংলাদেশ
প্রতীকী ছবি

২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জনে দ্রুত সম্প্রসারিত ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং খাতকে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে বাংলাদেশ।

এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার কর-সুবিধা, স্টার্টআপ সহায়তা, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দক্ষতা বিকাশ কর্মসূচিসহ ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যাতে দেশের লাখো তরুণ-তরুণীর সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যায়।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে ডিজিটাল উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে তরুণদের ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

তিনি বলেন, ‘স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং এবং ডিজিটাল উদ্যোক্তা কার্যক্রমকে উৎসাহিত করতে তরুণদের দক্ষতা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’

সরকারের কৌশলগত পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা এবং টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের প্রধান চালিকা শক্তি। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সুযোগের গণতন্ত্রায়ণের মাধ্যমে দেশের জনমিতিক সুবিধাকে ‘ডেমোক্রেটিক ডিভিডেন্ডে’ রূপান্তর করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) এবং টেলিযোগাযোগ খাতের অবদান মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ হলেও আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তা ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ডিজিটাল অর্থনীতির কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘প্রযুক্তি খাতে প্রতিবছর ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ফ্রিল্যান্সিং এবং সৃজনশীল শিল্পে ব্যাপক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরও ৮ লাখ পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে।’

সরকার মনে করে, দেশের মেধাবী তরুণ জনগোষ্ঠীই তার সবচেয়ে বড় সম্পদ। যথাযথ সহায়তা পেলে বাংলাদেশ বিশ্বমানের প্রযুক্তি কেন্দ্র গড়ে তুলতে সক্ষম হবে, যা বিশ্বের শীর্ষ উদ্ভাবনী কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে।

আউটসোর্সিং ও ফ্রিল্যান্সিং খাতের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে সরকার আইটি ফ্রিল্যান্সিংয়ের জন্য বিদ্যমান কর অব্যাহতি সুবিধা সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং আয়ের ক্ষেত্রে সম্প্রসারণ করেছে। একই সঙ্গে কনটেন্ট ক্রিয়েশন থেকে অর্জিত সব আয়কে সম্পূর্ণভাবে আয়করমুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে শুধুমাত্র আইটি ফ্রিল্যান্সিং আয়ের ওপর কর অব্যাহতি রয়েছে। আমি প্রস্তাব করছি, এই সুবিধা সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং আয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করা হোক। এতে ফ্রিল্যান্সাররা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে বৈদেশিক আয় পাঠাতে উৎসাহিত হবে।’

দেশের দ্রুত বিকাশমান ডিজিটাল কনটেন্ট শিল্পের জন্যও অতিরিক্ত প্রণোদনা ঘোষণা করে তিনি বলেন, ‘কনটেন্ট ক্রিয়েশন থেকে অর্জিত সব আয় সম্পূর্ণভাবে করমুক্ত করার প্রস্তাব করছি।’

এ ছাড়া কনটেন্ট নির্মাতা ও ফ্রিল্যান্সারদের সেবার ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।

স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে শক্তিশালী করতে নিবন্ধিত স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৩০ জুন ২০৩৫ পর্যন্ত সেবা, আমদানিকৃত সেবা এবং অফিস ভাড়ার ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। পাশাপাশি স্টার্টআপ ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের জন্য শূন্য শতাংশ টার্নওভার করের প্রস্তাব করা হয়েছে। 

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আইটি খাতে তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তার জন্য ৫০০ কোটি টাকার একটি ‘স্টার্টআপ ফান্ড’ গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি। এই অর্থ ‘স্টার্টআপ ফান্ড’ হিসেবে নারী উদ্যোক্তা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে ব্যবহার করা হবে।’

আরও পড়ুন

শুধু শহর নয়, গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকায়ও আউটসোর্সিংয়ের সুযোগ সম্প্রসারণে সাশ্রয়ী মূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে সরকার একটি ‘ন্যাশনাল ফাইবার ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা করছে।

এছাড়া দেশের ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর কাছে ফাইভ জি সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং ১০০ এমবিপিএস গতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ডিজিটাল সেবার দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের কাজ চলছে, যার মাধ্যমে নাগরিকরা একটি একক ডিজিটাল পরিচয়ের সাহায্যে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।

ডিজিটাল কর্মশক্তির জন্য প্রযুক্তি পণ্য সহজলভ্য করতে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, কম্পিউটার প্রিন্টার ও মনিটরের ওপর আরোপিত আমদানি শুল্ক, ভ্যাট এবং সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে মোবাইল ফোন উৎপাদনে ব্যবহৃত ২২ ধরনের কাঁচামালের ওপর অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ১ শতাংশে নামিয়ে এনে দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রের জন্য নতুন প্রজন্মকে প্রস্তুত করতে শিক্ষা ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংযুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি জনসেবা প্রদান ও তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও এআই ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সার ও আউটসোর্সিং সেবাদাতাদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে ‘স্মার্ট স্কিল ব্যাংক’ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ডিজিটাল সনদ প্রদানের জন্য একটি যাচাইকরণ কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে, যা বিদেশি নিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি করবে।

এ ছাড়া কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পলিটেকনিকগুলোকে শক্তিশালী করতে ১ হাজার বিদেশি বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষক এবং ৭ হাজার ৫০০ দেশীয় প্রশিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, কর-সুবিধা, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন, স্টার্টআপ সহায়তা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বৃহৎ পরিসরের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির সমন্বিত প্রভাব বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং খাতের বিশাল সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত করবে। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, আইসিটি খাতের অর্থনীতিতে অবদান বাড়বে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যে দেশ আরও এগিয়ে যাবে।

আরটিভি/ এসকেডি

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission