বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জাতীয় সংসদে বলেছেন, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশই তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত থেকে আসে। বিশ্ববাজারে এ খাতের অবস্থান ধরে রাখা এবং নতুন রপ্তানি গন্তব্য অনুসন্ধানের লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এক্ষেত্রে লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) সংরক্ষিত মহিলা আসনের সরকারি দলের সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনির টেবিলে উপস্থাপিত দেশের তৈরি পোশাক খাতের কার্যক্রম এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরকারের উদ্যোগ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।
মন্ত্রী জানান, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩১,৪৫৬.৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪২,৬১৪.৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। পরবর্তীতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি কমে ৩৮,১৪২.১০ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৬,১৫১.৩১ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা পুনরায় বেড়ে ৩৯,৩৪৬.৯৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়।
তিনি বলেন, তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে সরকার বিভিন্ন প্রণোদনা দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে রপ্তানিমুখী দেশীয় বস্ত্রশিল্পের জন্য বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও ডিউটি ড্র-ব্যাক সুবিধার বিকল্প হিসেবে ১ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ সহায়তা।
এছাড়া ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানিমুখী বস্ত্রখাতের জন্য অতিরিক্ত ০ দশমিক ৫ শতাংশ বিশেষ প্রণোদনা এবং নিটওয়্যার, ওভেন গার্মেন্টস ও সোয়েটার উপখাতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য অতিরিক্ত ৩ শতাংশ সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রী বলেন, তৈরি পোশাক খাতের জন্য ০ দশমিক ৩ শতাংশ বিশেষ নগদ প্রণোদনাও অব্যাহত রয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ফলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধার আওতায় বিদ্যমান অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। এর ফলে প্রায় ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) সম্পন্ন করেছে। একইসঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সিইপিএ) নিয়ে আলোচনা চলছে।
মন্ত্রী জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব (আরসিইপি), সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, চীনসহ সম্ভাবনাময় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ইপিএ, সিইপিএ ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে সরকার নিয়মিতভাবে ব্রাজিল, মধ্যপ্রাচ্য, জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিআইএসভুক্ত দেশসমূহ এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ করছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করা, বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করা এবং বাংলাদেশি পণ্যের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা, ডিউটি ড্র-ব্যাক, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধা, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) প্রদত্ত প্রণোদনা, কর অবকাশ এবং বাণিজ্যিক সুবিধা ও শুল্কমুক্ত বাজার প্রবেশাধিকারের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হচ্ছে।
নতুন বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানির বিষয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও কানাডার বাইরে নতুন বাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনা বহাল রয়েছে।
বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোকে জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের মতো এশীয় বাজারের পাশাপাশি আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় নতুন সুযোগ অনুসন্ধানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
মন্ত্রী বলেন, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রতিবছর ৩৫ থেকে ৪০টি আন্তর্জাতিক সোর্সিং ভিত্তিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্যকরণে কাজ করছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আটটি খাতের আওতায় ৪৬টি মেলায় অংশগ্রহণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ‘গ্লোবাল সোর্সিং এক্সপো’ নামে একটি সোর্সিং প্রদর্শনীর আয়োজন এবং একক পণ্যভিত্তিক বিশেষায়িত মেলার আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ঝুঁড়ি ও বাজার আরও সম্প্রসারিত হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রী বলেন, বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও বাণিজ্যিক উইংসমূহ রপ্তানি প্রসার, বাজার সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশি পণ্যের বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিংয়ে ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
আরটিভি/এসএস




