দেশের ক্রমবর্ধমান মৎস্যসম্পদ ও অমূল্য জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধ করতে জাতীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলনের আহ্বান জানিয়েছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) বিশিষ্ট শিক্ষক ও মৎস্য গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে তিনি এই জরুরি দাবি উত্থাপন করেন। “অবৈধ জাল বন্ধ কর, মৎস্যসম্পদ রক্ষা কর” স্লোগানকে সামনে রেখে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শেকৃবি সাংবাদিক সমিতির সভাপতি কামরুল ইসলাম সজল।
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী দেশের অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যে মৎস্যখাতের অপরিহার্য ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশ মানুষের সরাসরি জীবন ও জীবিকা এই মৎস্যখাতের ওপর নির্ভরশীল।
এছাড়া আমাদের দৈনন্দিন প্রাণিজ আমিষের চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশই আসে মাছ থেকে। তবে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, কারেন্ট জালসহ বিভিন্ন বিধ্বংসী ও অবৈধ জালের নির্বিচার ব্যবহারের ফলে পোনামাছ ও ডিমওয়ালা মা মাছ প্রতিনিয়ত নিধন হচ্ছে। এতে প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি জলজ জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
সরকারি তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি আরও জানান, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন ৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে তিনি উপকূলীয় অঞ্চলে অবৈধ জালের অবাধ ব্যবহারকে চিহ্নিত করেছেন।
তিনি বলেন, সরকার বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করলেও মাঠ পর্যায়ে অবৈধ জালের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। মোহনা ও উপকূলীয় এলাকায় এই জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা গেলে জাটকা ইলিশ রক্ষা পাবে এবং নদীতে ইলিশের প্রবেশ বাড়বে, যার ফলে বাজারে ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রশ্নোত্তর পর্বে এই গবেষক জেলেদের জীবনযুদ্ধের করুণ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় অনেক প্রান্তিক জেলে বাধ্য হয়ে সাগরে গিয়ে ট্রলারের শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন, যেখানে তারা তাদের আদি মালিকানা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার হারাচ্ছেন। এই সংকট উত্তরণে কেবল প্রশাসনিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয় বরং সামাজিক সচেতনতাও একান্ত প্রয়োজন।
তিনি সরকার, গণমাধ্যম, গবেষক, শিক্ষার্থী এবং সচেতন নাগরিকদের সমন্বয়ে ১০ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই কর্মসূচির মধ্যে কঠোর আইন প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং জেলেদের বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
উক্ত আলোচনা সভায় আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কালের কণ্ঠের সিনিয়র সাংবাদিক নিখিল ভদ্র, পার্লামেন্ট নিউজ বিডির সম্পাদক শাকিলা পারভিন, রিভার বাংলার সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ এবং পরিবেশকর্মী ইবনুল সাঈদ রানাসহ বিভিন্ন স্তরের গণমাধ্যমকর্মী ও গবেষকরা। উপস্থিত বক্তারা মৎস্যসম্পদ রক্ষায় এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলে আখ্যা দেন এবং দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় সম্মিলিত প্রচেষ্টার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
আরটিভি/এআর





