মাতৃত্বকালীন ছুটি না থাকায় বিপাকে নারী শিক্ষার্থীরা

কুবি প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ 

বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬ , ০৬:০৯ পিএম


মাতৃত্বকালীন ছুটি না থাকায় বিপাকে নারী শিক্ষার্থীরা
ছবি : আরটিভি

উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ও মাতৃত্বের দায়িত্ব এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) নারী শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ে মাতৃত্বকালীন ছুটি বা এ-সংক্রান্ত কোনো বিশেষ একাডেমিক নীতিমালা না থাকায় সন্তান জন্মদানের পরও তাদের ক্লাস, ইনকোর্স ও সেমিস্টার পরীক্ষায় অংশ নিতে হচ্ছে। এতে অনেকেই বাধ্য হয়ে সেমিস্টার ড্রপ দিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছেন।

সন্তান জন্মের পর চিকিৎসকের পরামর্শ থাকে অন্তত তিন মাস বিশ্রামে থাকার। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্যালেন্ডারে সেই বিশ্রামের কোনো সুযোগ নেই। নির্ধারিত সময়ে ক্লাসে উপস্থিতি, পরীক্ষা ও মূল্যায়নের বাধ্যবাধকতার কারণে মাতৃত্বের সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়েও অনেক নারী শিক্ষার্থীকে নবজাতক সন্তান এবং শিক্ষাজীবনের মধ্যে কঠিন এক সমীকরণ মেলাতে হচ্ছে। স্পষ্ট নীতিমালার অভাবে কেউ হারাচ্ছেন একটি সেমিস্টার, কেউবা পিছিয়ে পড়ছেন পুরো একটি বছর।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নারী শিক্ষার্থীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি ও বিশেষ একাডেমিক সুবিধার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো এ ধরনের কোনো নীতিমালা না থাকায় অন্তঃসত্ত্বা ও সদ্য মা হওয়া শিক্ষার্থীরা অনিশ্চয়তা ও সংকটের মধ্যেই উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন।

আরও পড়ুন

অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান পুরো গর্ভাবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ছিলেন। হলের খাবার তার জন্য উপযোগী না হওয়ায় বাসা থেকে রান্না করা খাবার কয়েক দিনের জন্য একসঙ্গে নিয়ে আসতেন। শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও উপস্থিতি নিশ্চিত করতে নিয়মিত ক্লাস করেছেন।

তিনি বলেন, শেষ দিকে একটি পরীক্ষা দিতে পারিনি। এখন সন্তান হওয়ার পর তাকে নিয়েই থাকতে হয়। ঈদের ছুটির পর সেমিস্টার শুরু হলেও এখনো ক্লাসে যেতে পারিনি। ডেলিভারির পর শরীর এতটাই দুর্বল থাকে যে এই অবস্থায় ক্লাস করা একজন সদ্য মায়ের পক্ষে সম্ভব নয়।

ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী সাবিহা আফরিন বলেন, সন্তান জন্মের পরও দুর্বল শরীর নিয়ে ক্লাস করতে হয়েছে। গর্ভাবস্থায়ও নিয়মিত ক্লাস করেছি। সবার সাথে মিডটার্মে অংশ নিতে পারিনি, পরে একা দিতে হয়েছে। এই কষ্ট একজন সদ্য মা হওয়া শিক্ষার্থীই অনুভব করতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে বেবি কেয়ার সিস্টেম চালু করা জরুরি।

বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বা বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী উপমা রানী বৃষ্টিও ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। তিনি বলেন, গর্ভাবস্থায় স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রয়োজন হলেও হলের খাবার তার জন্য উপযোগী নয়। পাঁচতলা সিঁড়ি ভেঙে ওঠানামাও আমার জন্য কষ্টকর। চিকিৎসক বেশি চলাফেরা কিংবা ভ্রমণ করতে নিষেধ করলেও উপস্থিতির বাধ্যবাধকতার কারণে নিয়মিত ক্লাসে যেতে হচ্ছে। ৬০ শতাংশ উপস্থিতি না থাকলে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরা কোনো ধরনের ছাড় দিতে চান না।

আরও পড়ুন

তিনি আরো বলেন, সেমিস্টারের সময় ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারি না, সেমিস্টার খারাপ হয়। পরে জুনিয়রদের সাথে ইনপ্রুভ দিতে হয়। অক্টোবরে আমাদের সেমিস্টার আর ওই সময় আমার ডেলিভারি ডেইট। আমি বন্ধুদের ছেড়ে জুনিয়রদের সাথে ক্লাস করতে চাই না। প্রশাসনের কাছে আমার একটাই দাবি, অন্তঃসত্ত্বা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ছুটির ব্যবস্থা করা হোক। আমার যেন ইয়ার লস না হয়।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী উম্মে হানি নাভিলার অভিজ্ঞতাও এ সংকটেরই প্রতিফলন। সন্তান জন্মদানের সম্ভাব্য সময় দ্বিতীয় সেমিস্টার পরীক্ষার সঙ্গে মিলে যাওয়ায় তিনি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি।  

তিনি বলেন, মাতৃত্বকালীন ছুটি না থাকায় আমি তখন সেমিস্টারে বসতে পারিনি। ফলে বাধ্য হয়ে এক বছর ড্রপ দিয়ে জুনিয়রদের সঙ্গে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেন।

নাভিলা আরও বলেন, সঠিক তথ্য ও সুস্পষ্ট নীতিমালা না থাকায় আমার শিক্ষাজীবনের একটি বছর নষ্ট হয়েছে। স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলে হয়তো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না।

একই বিভাগের শিক্ষার্থী মাসুমা জান্নাত বলেন, গর্ভাবস্থায় বিভাগের শিক্ষকরা সহযোগিতা করলেও সন্তান জন্মের পর বাস্তবতা বদলে যায়। চিকিৎসক তিন মাস বিশ্রাম নিতে বলেছেন। কিন্তু তিন মাস বিশ্রাম নিলে সেমিস্টার মিস হয়ে যাবে। সিজারের পর দুর্বল শরীর নিয়ে ক্লাস করা অসম্ভব। অন্তত তিন মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং ক্যাম্পাসে একটি বেবি কেয়ার রুম থাকা উচিত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শক ও বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম বলেন, মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা এমন হতে হবে যাতে গর্ভবতী শিক্ষার্থী ও অন্য শিক্ষার্থীদের কেউই ক্ষতিগ্রস্ত না হন। একজন শিক্ষার্থীর জন্য পুরো সেমিস্টার পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. এম. শরীফুল করীম বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো শিক্ষার্থী আনুষ্ঠানিকভাবে মাতৃত্বকালীন ছুটির দাবি জানায়নি। দাবি এলে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। এছাড়া শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট কোর্স শিক্ষকের কাছে আবেদন করে একাডেমিক সহায়তা চাইতে পারবেন। তবে সেটি সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

আরটিভি/এমএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission