ছোট্ট দুটি হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরল অতিথিদের। মুখভরা হাসি, চোখে উচ্ছ্বাস। কিছুক্ষণ আগেও যে শিশুটি ছিল নিজের মতো, নতুন মানুষ দেখে একটু সংকোচে, সে-ই এখন গল্প করছে, গান গাইছে, নিজের হাতে বানানো একটি ছোট্ট ফুলের তোড়া দেখিয়ে গর্বভরে বলছে—‘এটা আমি বানিয়েছি।’
এই হাসির পেছনে আছে দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, যত্ন আর ভালোবাসা। আর আছে একদল তরুণের নিরলস প্রচেষ্টা। যারা বিশ্বাস করেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের করুণা নয়, প্রয়োজন সুযোগ; দয়া নয়, প্রয়োজন সমান মর্যাদা। সেই বিশ্বাস থেকেই যাত্রা শুরু সামাজিক উদ্যোগ ‘সক্ষম’-এর।
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) আটজন তরুণ-তরুণীর এই উদ্যোগের লক্ষ্য—বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে তারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে এবং সমাজও তাদের নতুন চোখে দেখতে শিখবে।
আশপাশের কিছু পরিবারের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন এই তরুণদের ভাবিয়ে তুলেছিল। তাদের মনে প্রশ্ন জেগেছিল—এই শিশুদের জন্য কি কিছু করা যায় না? সেই ভাবনা থেকেই তারা খুঁজে পান দিনাজপুর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়কে।

২০২৬ সালের ১০ মে প্রথমবারের মতো বিদ্যালয়টিতে যান আটজন তরুণ-তরুণী। মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সামাজিক প্রকল্পের অংশ হিসেবে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করা। কিন্তু সেদিনের অভিজ্ঞতা বদলে দেয় তাদের ভাবনা।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জীবন, তাদের চ্যালেঞ্জ এবং তাদের সঙ্গে সংবেদনশীলভাবে আচরণের বিষয়গুলো সম্পর্কে জানার পর দীর্ঘ সময় কাটে শিশুদের সঙ্গে গল্প, খেলাধুলা ও আনন্দ ভাগাভাগিতে। সেই একটি দিনের অভিজ্ঞতাই পরিণত হয় দীর্ঘমেয়াদি একটি সামাজিক উদ্যোগে।
আটজন কো-ফাউন্ডারের পরিচয় হয়েছিল একটি ট্রেনিং প্রোগ্রামে। সেখানে দুই মাসের একটি সামাজিক প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়ে তারা একসঙ্গে কাজ করেন। কাজ করতে গিয়েই উপলব্ধি করেন, সমাজের জন্য কিছু করার স্বপ্ন তাদের সবারই এক। অ্যাসাইনমেন্ট শেষ হলেও শেষ হয়নি তাদের পথচলা; বরং সেখান থেকেই শুরু হয় ‘সক্ষম’-এর যাত্রা।
বর্তমানে দিনাজপুর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সঙ্গে নিয়মিত কাজ করছে ‘সক্ষম’। এখন পর্যন্ত সংগঠনটি ১১টি ফিল্ড ভিজিট সম্পন্ন করেছে।
প্রতিটি ভিজিটে শিশুদের সঙ্গে গল্প, খেলাধুলা, গান, শিক্ষামূলক কার্যক্রম ও সৃজনশীল চর্চায় অংশ নেন সদস্যরা। পাশাপাশি হাতে-কলমে বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প তৈরির প্রশিক্ষণও দেন। পরে সেই পণ্যগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত স্টল এবং ‘সক্ষম’-এর ফেসবুক পেজের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
শিশুদের তৈরি পণ্যের সংগ্রহে রয়েছে ওয়াল ম্যাট, ফুলের তোড়া (বুকে), কানের দুল, চুলের ক্লিপসহ নানা ধরনের হস্তশিল্প। সংগঠনের সদস্যদের ভাষ্য, এসব পণ্য বিক্রির উদ্দেশ্য শুধু অর্থনৈতিক সহায়তা নয়; বরং শিশুদের সৃজনশীল কাজের স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করা।
‘সক্ষম’-এর কো-ফাউন্ডার সাফওয়াত সাইমা শাহানা বলেন, “আমাদের উদ্দেশ্য ছিল সমাজের মানুষের ভ্রান্ত ধারণাগুলো দূর করা—অটিজম আক্রান্ত শিশু ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা কিছুই করতে পারে না, এই ধারণা বদলানো। তাদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমরা নিজেরাও প্রতিনিয়ত অবাক হয়েছি। তারা অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণের চেয়েও অসাধারণ। তাদের উপস্থিত বুদ্ধি ও প্রতিক্রিয়া আমাদের মুগ্ধ করেছে। আমরা তাদের শেখাতে গিয়েছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারাই আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
আরেক কো-ফাউন্ডার ইয়ামিন ফারিয়া বলেন, “আজ ‘সক্ষম’কে যতটা সক্ষম মনে হয়, এর পেছনের পথটা ছিল অনেক কঠিন। অটিজম স্পেকট্রামের শিশুদের সঙ্গে কাজ করতে প্রচুর সময়, ধৈর্য ও শ্রম দিতে হয়। কিন্তু দিন শেষে আমরা গর্বিত যে এমন একটি ক্ষেত্রকে বেছে নিতে পেরেছি। আমরা দেখাতে পেরেছি, অটিজম স্পেকট্রামের শিশু এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও অনেক কিছু করতে পারেন। প্রয়োজন শুধু ধৈর্য, আন্তরিকতা এবং তাদের প্রতি বিশ্বাস।”
দিনাজপুর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবুল শাহনেওয়াজ বলেন, “প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয়। আমাদের শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন নিজেদের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের পাশে আমাদের সবার এগিয়ে আসা উচিত।”
একজন অভিভাবক বলেন - "তারা অনেকেই আছে যারা সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কাজ করতে পারে বা কোনো নির্দিষ্ট কাজে পারদর্শী।কিন্তু তাদেরকে ভরসা করে কাজ দিতে চায় না বা করাতে চায় না।'সক্ষম' তাদেরকে সেই ভরসা করায় আমরা আনন্দিত এবং আশাবাদী যে তারা এই সক্ষমের মাধ্যমে আরো মানুষের মন ও ভরসা জয় করতে পারবে।'
এ পর্যন্ত ‘সক্ষম’-এর মূল দলে রয়েছেন আটজন কো-ফাউন্ডার। তারা হলেন মাহামুদুল হাসান রিফাত, ইয়ামিন ফারিয়া, আনিকা জাহান অবন্তি, মেহেদী হাসান সাকিব, সাফওয়াত সাইমা শাহানা, হাবিবুল বাশার, মো. রাহুল চৌধুরী এবং ত্রয়ী সরকার।
সংগঠনটির এখনো কোনো স্পন্সর, অনুদানদাতা বা প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদার নেই। সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে প্রতিষ্ঠাতাদের ব্যক্তিগত অর্থায়নে। স্বেচ্ছাসেবক কার্যক্রমও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়নি। তবে খুব শিগগিরই স্বেচ্ছাসেবক যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংগঠনের সদস্যদের কাছে সবচেয়ে বড় সাফল্য কোনো পুরস্কার বা সম্মাননা নয়। তাদের ভাষায়, প্রতিবার বিদ্যালয়ে গেলে যখন শিশুরা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে, হাসিমুখে গল্প করে কিংবা নিজের হাতে তৈরি কোনো জিনিস দেখাতে উচ্ছ্বসিত হয়—সেই মুহূর্তগুলোই তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।

একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন তারা। শুধু শিশুরাই নয়, সেই শিক্ষার্থীরাও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে বদলে ফেলেছিলেন নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি। তখনই ‘সক্ষম’-এর সদস্যরা আরও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে পারলে সমাজও বদলাবে।
আগামী এক বছরে স্বেচ্ছাসেবক যুক্ত করা, আরও বেশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর কাছে পৌঁছানো এবং সচেতনতামূলক নতুন কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে ‘সক্ষম’-এর। দীর্ঘমেয়াদে তাদের লক্ষ্য আরও বড়। এই মুহূর্তে একটি বিদ্যালয়ের সঙ্গে কাজ করলেও ভবিষ্যতে আরও বেশি বিশেষায়িত বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে চায় সংগঠনটি। পাশাপাশি যেসব বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু কোনো বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না, তাদের কাছেও পৌঁছে যেতে চান তারা। শুধু শিশুদের ক্ষমতায়ন নয়, সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
এই উদ্যোগে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যুক্ত হতে কিংবা শিশুদের তৈরি হস্তশিল্প সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা যাবে ‘সক্ষম’-এর ফেসবুক পেজে।
একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ এক দিনে গড়ে ওঠে না। সেটি গড়ে ওঠে ছোট ছোট উদ্যোগ, আন্তরিকতা, ধৈর্য এবং মানুষের প্রতি বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে। ‘সক্ষম’-এর তরুণেরা সেই বিশ্বাস নিয়েই এগিয়ে চলেছেন।

তাদের প্রত্যাশা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সীমাবদ্ধতা নয়, বরং তাদের প্রতিভা, সৃজনশীলতা এবং সক্ষমতাই একদিন সমাজের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে। কারণ, সুযোগ পেলে তারাও পারে—স্বপ্ন দেখতে, সৃষ্টি করতে এবং নিজের পরিচয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে।
সেই বিশ্বাস থেকেই ‘সক্ষম’-এর পথচলা। আর সেই বিশ্বাসই বলে—প্রত্যেক মানুষেরই একটি পরিচয় আছে, সে সক্ষম।
আরটিভি/ এসকেডি



