২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ভারতের চেন্নাইয়ে প্লাস্টিকের ব্যাগে খণ্ড-বিখণ্ড এক নারীর দেহাবশেষ উদ্ধারের ঘটনায় তামিলনাড়ু পুলিশ এক জটিল তদন্তের মুখোমুখি হয়। প্রায় ১১ হাজার ৭০০ টন আবর্জনা খুঁজেও নিহতের মাথা ও বাঁ হাত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে ডান হাতে থাকা দুটি ট্যাটুর সূত্র ধরেই শেষ পর্যন্ত নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। তিনি ছিলেন ৩৭ বছর বয়সী উদীয়মান তামিল অভিনেত্রী সন্ধ্যা।
পুলিশ জানায়, পল্লীকরনাই ডাম্পইয়ার্ডের কাছে একটি প্লাস্টিকের বস্তা থেকে প্রথমে একটি কাটা হাত ও দুটি পা উদ্ধার করা হয়। পরে আদিয়ার নদীর তীরসহ চেন্নাইয়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাড়গোড়, শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ এবং দেহের অন্যান্য অংশ উদ্ধার করা হয়। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেন, সব দেহাবশেষ একই নারীর এবং তাকে হত্যার পর ধারালো অস্ত্র দিয়ে খণ্ড-বিখণ্ড করা হয়েছে।
তবে নিহতের মাথা ও বাঁ হাত না থাকায় চেহারা বা আঙুলের ছাপের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছিল না। এ ঘটনায় উপপুলিশ কমিশনার মুথুসামীর নেতৃত্বে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হয়। পল্লীকরনাই ডাম্পইয়ার্ডে প্রায় ১১ হাজার ৭০০ টন আবর্জনা তল্লাশি চালিয়ে দেহের আরও কিছু অংশ উদ্ধার হলেও মাথা ও বাঁ হাতের কোনো সন্ধান মেলেনি।
পরে উদ্ধার হওয়া ডান হাতে আঁকা শিব-পার্বতী ও একটি ড্রাগনের ট্যাটু তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে। ঠিক সেই সময় থুথুকুডির এক নারী থানায় এসে জানান, তার ৩৭ বছর বয়সী মেয়ে সন্ধ্যা প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ। তিনি জানান, মেয়ের স্বামী বালাকৃষ্ণন দাবি করেছিলেন, সন্ধ্যা ১৯ জানুয়ারি থুথুকুডির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। কিন্তু তিনি কখনোই সেখানে পৌঁছাননি।
নিহতের হাতের ট্যাটু, একটি বিশেষ তিল এবং অলংকার দেখে সন্ধ্যার মা মেয়েকে শনাক্ত করেন। পরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তার পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়।
পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর পুলিশ সন্ধ্যার স্বামী ও তামিল চলচ্চিত্র নির্মাতা বালাকৃষ্ণনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। শুরুতে তিনি স্ত্রী বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন বলে দাবি করলেও জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে হত্যার কথা স্বীকার করেন।
পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে বালাকৃষ্ণন জানান, ২০১৯ সালের ১৯ জানুয়ারি রাতে পরকীয়ার সন্দেহকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে তীব্র ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে তিনি ঘরে থাকা একটি কুড়াল দিয়ে স্ত্রীকে হত্যা করেন। পরদিন তিনি মরদেহ খণ্ড-বিখণ্ড করে প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে চেন্নাইয়ের বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেন।
তদন্তে দম্পতির বাসা থেকে রক্তের দাগ, দেহ বহনে ব্যবহৃত একই ধরনের প্লাস্টিকের বস্তা এবং দেহ খণ্ডিত করতে ব্যবহৃত ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এছাড়া গভীর রাতে মোটরসাইকেলে করে প্লাস্টিকের বস্তা বহনের সিসিটিভি ফুটেজও জব্দ করে পুলিশ।
পুলিশি তদন্তে আরও জানা যায়, থুথুকুডির বাসিন্দা সন্ধ্যা ও বালাকৃষ্ণনের দাম্পত্যজীবন দীর্ঘদিন ধরেই পারিবারিক সহিংসতা ও আর্থিক সংকটে জর্জরিত ছিল। ২০১৮ সালে সন্ধ্যা পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগও করেছিলেন। অন্যদিকে চলচ্চিত্র প্রযোজনায় লোকসানের কারণে বালাকৃষ্ণন আর্থিক চাপে ছিলেন। এ সময় অভিনয়জগতে নতুন করে ক্যারিয়ার গড়ার চেষ্টা করা সন্ধ্যাকে নিয়ে তার মধ্যে পরকীয়ার সন্দেহ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
তদন্তকারীরা ঘটনার পুনর্গঠন করতে এবং অধিকাংশ দেহাবশেষ উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও, হত্যার কয়েক বছর পরও সন্ধ্যার মাথা ও বাঁ হাত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পুলিশের ধারণা, পরিচয় গোপন করতেই ওই দুটি অংশ আলাদাভাবে গুম করে দেওয়া হয়েছিল। তবে একটি হাতের ট্যাটু এবং মায়ের দেওয়া তথ্যই শেষ পর্যন্ত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
সূত্র: এনডিটিভি
আরটিভি/এসকে



