ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানী কলকাতায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ১৩৬ বছরের ঐতিহ্যবাহী একটি মসজিদ। শহরের নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকার ভেতরে মসজিদটি অবস্থিত। সেখানে ঢুকতে মুসল্লিদের এন্ট্রি পাস দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
সোমবার (১৩ জুলাই) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে এ তথ্য।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় নিরাপত্তা ও রানওয়ে সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে ইতোমধ্যে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু মসজিদ কমিটি বলছে, আলোচনা চলমান থাকাবস্থায় নামাজের জন্য মুসল্লিদের প্রবেশ বন্ধ করার কোনও প্রয়োজন ছিল না।
কলকাতা বিমানবন্দরের ভেতরে অবস্থিত ১৩৬ বছরের পুরোনো এই গৌরীপুর জামে মসজিদটি ‘বাঁকড়া মসজিদ’ নামেও পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরেই মসজিদটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। মূলত, দমদম বিমানবন্দরে দুটি রানওয়ে রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান রানওয়েটি বড় উড়োজাহাজের ওঠানামায় ব্যবহৃত হয়। দ্বিতীয় রানওয়েটি তুলনামূলক ছোট এবং মসজিদটি সেটির কাছেই অবস্থিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধান রানওয়ে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ থাকলে বড় উড়োজাহাজ দ্বিতীয় রানওয়ে ব্যবহার করতে সমস্যায় পড়বে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, মসজিদটি উড়োজাহাজের ওঠানামার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। এছাড়া দ্বিতীয় রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজও আটকে আছে।
এমন অবস্থায় গত শনিবার থেকে মসজিদে প্রবেশের জন্য নতুন করে এন্ট্রি পাস দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। ফলে, মসজিদে নামাজ আদায়ও বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে যেকোনও ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে সেখানে।
এ বিষয়ে রোববার (১২ জুলাই) পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তা এবং বিমানবন্দরের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এ বিষয়ে আমি আর কোনও মন্তব্য করব না। কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ চীন ও বাংলাদেশ কাছেই রয়েছে। তাই বাইরের লোকজনের জন্য বিমানবন্দরের প্রবেশপথ খোলা রাখা যায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিরোধীরা যা বলছে, তার বিপরীতে আমরা কারও ধর্ম পালনে বাধা দিইনি। ঈদে পশু জবাই-সংক্রান্ত আইন মেনে উৎসব হয়েছে, মহররমেও অস্ত্র প্রদর্শন ছাড়াই অনুষ্ঠান হয়েছে। আইন মেনে চলুন, ভালো নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করুন। ধর্মকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে পালন করুন, অন্যের ওপর তা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবেন না। তাহলে সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চলবে।’
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারও মুখ্যমন্ত্রীর অবস্থানকে সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ছাত্রজীবন থেকেই সংবাদপত্রে পড়ে আসছি, কলকাতা বিমানবন্দরের একটি মসজিদের কারণে রানওয়ে নির্মাণ সম্ভব হচ্ছে না। তোষণের রাজনীতির কারণে আগের কোনও সরকার এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেনি। এখন আমাদের সরকার ক্ষমতায়। আমরা তোষণের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। মসজিদটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে।’
দমদম উত্তর আসনের বিজেপি বিধায়ক সৌরভ শিকদারের বিধানসভা এলাকার মধ্যেই বিমানবন্দরটি অবস্থিত। তিনি দাবি করেন, বিমানবন্দরের ভেতরে মসজিদটি থাকায় দুটি রানওয়ের পূর্ণ ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
তার দাবি, নামাজ পড়তে আসা লোকজনের বিমানবন্দরের পাস বা পরিচয় যাচাইয়ের প্রয়োজন হয় না। তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দর একটি উচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন এলাকা। এখানে প্রবেশ করতে হলে ছবি-সংবলিত বায়োমেট্রিক পাস নিতে হয়। অথচ, মসজিদটি সর্বোচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত ‘লেভেল-৩’ এলাকায় অবস্থিত।’
সৌরভ শিকদার আরও বলেন, প্রতি মাসে লাখো যাত্রীর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রীসহ ভিভিআইপিরাও এই বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। তিনি জানান, নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি উল্লেখ করে তার দল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেছে।
পশ্চিমবঙ্গের আরেক মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ দাবি করেন, ইচ্ছাকৃতভাবেই মসজিদটিকে রানওয়ের এলাকায় থাকতে দেওয়া হয়েছিল। মসজিদটি ওই স্থানে থাকার কোনও যৌক্তিকতা ছিল না। এখন সেখানে নামাজও বন্ধ হয়েছে। আমার বিশ্বাস, জায়গাটি খালি করে দেওয়া হবে, যাতে রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজ নির্বিঘ্নে এগিয়ে নেওয়া যায়।
এদিকে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আগের মন্ত্রিসভার সাবেক মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী নামাজ বন্ধের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। ভারতীয় বার্তাসংস্থা পিটিআইকে তিনি বলেন, মসজিদটি ১৩৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে সেখানে রয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছিল। সেই আলোচনার মধ্যেই মসজিদটিতে মুসল্লিদের প্রবেশ বন্ধ করার প্রয়োজন ছিল না।
আরটিভি/এসএইচএম




