যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের আজ ২২ দিনে গড়িয়েছে। যুদ্ধের প্রথম আঘাতেই ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে সপরিবারে হত্যার দাবি করা হলেও, দেশটির ইসলামী শাসনতন্ত্রের অবসান ঘটাতে ব্যর্থ হয়ে একের পর এক শীর্ষ নেতা ও কমান্ডারদের লক্ষ্যবস্তু করছে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব। তবে দমে যাওয়ার পাত্র নয় তেহরানও; ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে বিধ্বংসী হামলা চালিয়ে শত্রুপক্ষকে নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে তারা।
এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তাদের পরিচালিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে। শুক্রবার (২০ মার্চ) তিনি একে ‘সামরিক বিজয়’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই দাবি ইরানের কঠোর বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আক্রান্ত হয়েও ইরান কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে এবং পুরো অঞ্চলজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে। ফলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন—প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ধীরে ধীরে এই যুদ্ধের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন। বিট্রিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্স তাদের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ প্রণালী সুরক্ষিত করতে মিত্র দেশগুলোর সাহায্য চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে ন্যাটো দেশগুলোকে ‘কাপুরুষ’ বলে অভিহিত করেছেন। হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ সূত্রমতে, ন্যাটোর সদস্য ও অন্যান্য বিদেশি সহযোগীদের নৌবাহিনী মোতায়েনে অনাগ্রহ ট্রাম্পকে অপ্রস্তুত করে দিয়েছে।
সাবেক রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটিক প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্য আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার কঠোর ভাষায় বলেন, ‘ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ নামক একটি ফাঁদে নিজেই পা দিয়েছেন এবং তিনি বুঝতে পারছেন না কীভাবে তা থেকে বের হবেন। এটাই তার বর্তমান হতাশার সবচেয়ে বড় কারণ।’
এদিকে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর প্রশাসনের ভেতরে ধীরে ধীরে এই উপলব্ধি তৈরি হয়েছে যে, সংঘাতের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে আগে আরও ভালোভাবে পরিকল্পনা করা উচিত ছিল। ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল ইরানের পাল্টা আঘাতের ক্ষমতাকে তুচ্ছজ্ঞান করা।
তবে মিত্রদের এই অনাগ্রহের পেছনে অনেক বিশ্লেষক ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির প্রভাবকেই দায়ী করছেন। কেননা পুনরায় ক্ষমতা পেয়ে তিনি গত ১৪ মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত জোটগুলোকে খাটো করে দেখে আসছেন। এমনকি ইসরায়েলের সঙ্গেও সমন্বয়ের অভাব প্রকাশ পেয়েছে; ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলার বিষয়ে ট্রাম্প আগে থেকে না জানার দাবি করলেও ইসরায়েল বলছে, হামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই সমন্বয় করে করা হয়েছিল।
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে অবশ্য ইরানের অভিযানকে বড় ধরনের সাফল্য হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। এক কর্মকর্তার মতে, ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা, নৌবাহিনীর বড় অংশ ডুবিয়ে দেওয়া এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার বহুলাংশে ধ্বংস করা একটি ‘অনস্বীকার্য সামরিক সাফল্য’।
তবে এই সাফল্যের দাবির আড়ালে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রক্ষা করা এখন বড় ঝুঁকির মুখে।
রিপাবলিকান কৌশলবিদ ডেভ উইলসন সতর্ক করেছেন, যখন জ্বালানির দাম বাড়তে থাকবে এবং সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলবে কেন তাদের বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে, তখন ট্রাম্পের জনসমর্থন কমতে শুরু করবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত জন বাস বলেন, "তারা সম্ভাব্য পরিস্থিতিগুলো নিয়ে যথেষ্ট ভাবেননি—যেখানে যুদ্ধ পরিকল্পনা অনুযায়ী না-ও এগোতে পারে।"
আরটিভি/এআর




