সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পর পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় বসতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।
এমন পরিস্থিতিতে সবার নজর পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রীর দিকে। এই পদের জন্য এগিয়ে আছেন রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখ শুভেন্দু অধিকারী। তিনি গত কয়েক বছর ধরে অযাচিত বিভিন্ন কথা বলে নিজেকে আলোচনায় রেখেছেন নিজেকে। বিশেষ করে, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বাংলাদেশ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন শুভেন্দু।
১. ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশে আলু-পেঁয়াজ বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে মন্তব্য করেন। এক সমাবেশে শুভেন্দু বলেছিলেন, আজ সিনেমার ট্রেলার দেখিয়ে গেলাম। বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার বন্ধ না হলে এবং চিন্ময় কৃষ্ণ দাস মুক্তি না পেলে পাঁচ দিন স্থলবন্দর বন্ধ থাকবে। তারপর ২০২৫ সালে লাগাতার বন্ধ করে দেওয়া হবে। আলু-পেঁয়াজ কী করে যায়, তা আমরা দেখব।
২. ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশে রাফাল পাঠিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। সেদিন এক সমাবেশে শুভেন্দু বলেছিলেন, বেশি লাফালাফি করবেন না। কতগুলো অর্বাচীন ঢাকাতে দাঁড়িয়ে কাল বলছে, চার ঘণ্টার মধ্যে নাকি কলকাতা দখল করবে। ওই লোকগুলো কোন স্কুল-কলেজে পড়েছে বলে জানা নেই আমার। বিজ্ঞানের ন্যূনতম ধ্যান-ধারণা আছে বলে জানা নেই আমার। কতগুলো মাদরাসাতে পড়েছে, ওই জন্য ঢাকা থেকে ওই ধরনের কথাবার্তা বলছে।
তিনি বলেন, আমাদের হাসিমারা বিমানঘাঁটিতে যে রাফাল বিমানগুলো রাখা আছে না, তার একটা যদি পাঠিয়ে দেওয়া হয়, শুধু আওয়াজেই ওদের... আমি বলতে পারি। ভারত কত বড় সামরিক শক্তি ধরে এটা রাশিয়া জানে, আমেরিকা জানে, চীন জানে। ভারত থেকে পেঁয়াজ আর আলু না গেলে যাদের খাওয়া জোটে না, ওদের নুন তৈরি হয় কাঁচা নুন। কিন্তু আয়োডিনটা পাঠাতে হয় ভারতকে, তারপরে পরিশোধিত নুন তৈরি হয়। আমরা ওদের ওপর নির্ভর করি না।
৩. ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর তিনি তিন লাখ রিকশা রওনা দিয়েছে কলকাতা দখলের জন্য এমন মন্তব্য করেছিলেন। বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে শুভেন্দু বলেন, বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন তারা ভারতকে শত্রু রাষ্ট্র ঘোষণা করার কথা বলছে, হিজবুত তাহরীর—এরা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল ৭১ সালে। তখন ভারত ছেড়ে দিয়েছিল। এবারও এরা ধরা পড়বে, এবার যাতে ছাড়া না হয়। যে ভাষায় উত্তর দিলে এরা সন্তুষ্ট হয় সেই ভাষায় উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা প্রস্তুত থাকব।
তিনি বলেন, আমার কাছে খবর আছে, ঢাকা থেকে তিন লাখ হাতে টানা রিকশা রওনা দিয়েছে কলকাতা দখল করার জন্য। আরে ওদের আছেটা কী ভাই? আছে কী? রাফাল রাখা আছে হাসিমারায়—শুধু আওয়াজ দিলেন না, ওখান থেকে, আমি কালকেও বলেছি আবারও বলছি ভদ্র ভাষায় বলছি…।
তিনি আরও বলেন, ওখানে মৌলবাদী জঙ্গিদের হাতে রাষ্ট্রযন্ত্র চলে গেছে। আমেরিকা এসে ওসামা বিন লাদেন বা হামাস প্রধানের যে অবস্থা করেছে, সেই একই অবস্থা বাংলাদেশের জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ, এই র্যাডিক্যাল ফোর্সকে শিকড়সুদ্ধ তুলে উপড়ে ফেলার কাজ বিশ্ব সমাজ করবে।
৪. ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর তিন মন্তব্য করেছিলেন- হাসিনা বৈধ প্রধানমন্ত্রী। একটি কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে শুভেন্দু বলেন, হাসিনা ওয়াজেদ বৈধ প্রধানমন্ত্রী। এরা অবৈধ। হাসিনা ওয়াজেদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই ঢাকাতে শাহজালাল এয়ারপোর্টে নামবেন।
তিনি বলেন, আমরা ওই দেশ সৃষ্টি করেছি। আমাদের ১৭ হাজার সেনা বলিদান দিয়েছে। আমরা মুজিবুর রহমানকে প্রোটেকশন দিয়েছি। আমাদের দেশ দালাই লামাকে প্রোটেকশন দিয়েছে। ভারত এটা করে। হাসিনা ওয়াজেদকে সরাতে গেলে আরেকটা ভোটে নির্বাচনে গিয়ে সরাতো। এটা অবৈধ কেয়ারটেকার। আমার বিশ্বাস, আমেরিকা-ভারতসহ মানবতাবাদী দেশগুলো এগিয়ে এসে অবৈধ সরকারকে উৎখাত করবে।
৫. ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি তিনি মন্তব্য করেছিলেন- ওসামা বিন লাদেনের চেয়েও খারাপ অবস্থা হবে। বাংলাদেশের দিকে ইঙ্গিত করে শুভেন্দু বলেন, ভারত এখন পৃথিবীর তৃতীয় সামরিক শক্তিশালী দেশ। ভারত অত্যন্ত দায়িত্বশীল দেশ, দুর্বল দেশকে আক্রমণ করে না। এরা জানে না যে সেনা পাঠানোর দরকার হবে না। আমরা এখন ড্রোনে এত এত বেশি উন্নত, এরা জানেই না। গোটা পাঁচ-সাতেক ড্রোন পাঠিয়ে দিলেই ওদের কাজ শেষ হয়ে যাবে। ওসামা বিন লাদেনের থেকেও খারাপ অবস্থা হবে।
তিনি বলেম, ওই বালুরঘাট সীমান্তে কটা ট্যাঙ্ক নিয়ে এসেছে, নিয়ে এসে খড়গাদা দিয়ে সাজিয়েছে। আমাদের ট্যাঙ্ক লাগে না, এখন ট্যাঙ্ক দিয়ে যুদ্ধ হয় না। ওরা ষাট-সত্তর সালে আছে। এখন ট্যাঙ্কের যুদ্ধ হয় না, বন্দুকের যুদ্ধ হয় না, ম্যানপাওয়ার লাগে না, পাঁচটা ড্রোন শুধু পাঠাবে ভারত।
৬. ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি তিনি মন্তব্য করেছিলেন- কয়েক মিনিটেই ফয়সালা হয়ে যাবে। শুভেন্দু বলেন, ইউনূস যুদ্ধ লাগিয়ে রাষ্ট্রপ্রেমের জিকির তুলে টিকে থাকতে চাইছে। কিন্তু ভারতীয় বিএসএফ সংযমের পরিচয় দিচ্ছে। কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে যুদ্ধ ভারতের কাছে তো কয়েকদিনের ব্যাপার নয়, কয়েক মিনিটেই ফয়সালা হয়ে যাবে। চিমটি কাটছে, আঁচড় কাটছে—আমরা বড় ভাই হিসেবে সহ্য করছি। বেড়া আমরা দেবই।
৭. ২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর তিনি দীপু দাস হত্যার প্রতিবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশন ঘেরাও করার মন্তব্য করেছিলেন। শুভেন্দু বলেন, আমরা এখানে ভারত সরকারের কমার্স অফিসেও যাব। গিয়ে বলব এক টন এক্সপোর্ট পারমিটও এখান থেকে দেওয়া যাবে না। এক কেজি পেঁয়াজও ওখানে পাঠানো যাবে না। যতক্ষণ না দীপু দাসের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা হয়।
তিনি বলেন, আমরা পুনরায় ১০ হাজার মানুষ নিয়ে আমরা বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশন অভিযান করব। যতক্ষণ না দীপু দাসের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, আমরা ডেপুটি হাই কমিশনারকে সুস্থভাবে এখানে অফিসে বসতে দেব না। এক কেজি পেঁয়াজও বাংলাদেশে পাঠাতে দেব না, দেব না, দেব না।
৮. ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর ইসরায়েল যেমন গাজায় শিক্ষা দিয়েছে, সেভাবে বাংলাদেশকে শিক্ষা দেওয়া নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। দীপু দাস হত্যার প্রতিবাদে আয়োজিত আরেক কর্মসূচিতে শুভেন্দু বলেন, এই লোকদের অবশ্যই একটা শিক্ষা দিতে হবে। ঠিক যেমনটা ইসরায়েল গাজাকে দিয়েছে। আমাদের সরকার হিন্দু এবং দেশের স্বার্থে কাজ করছে। অপারেশন সিঁদুরে আমরা যেভাবে পাকিস্তানকে শিক্ষা দিয়েছিলাম, ঠিক তেমনি একটা শিক্ষা তাদেরও দিতে হবে।
আরটিভি/এসএস



