সদ্য সমাপ্ত গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাই-প্রোফাইল সফরসঙ্গী দলের অংশ হিসেবে চীন সফর করেন প্রযুক্তি বিলিয়নেয়ার ইলন মাস্ক। সফরকালে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) চীনের ‘চংকিং ইস্ট’ রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণের একটি ভিডিও শেয়ার করেন। মেঝের আয়তনের (ফ্লোর এরিয়া) দিক থেকে এটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রেলওয়ে স্টেশন।
গণপরিবহন নিয়ে অতীতে সবসময় সংশয় প্রকাশ করে আসা মাস্ক কেন এই ভিডিও পোস্ট করলেন, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। তবে এই কৌতূহলের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় হলো এই বিশাল স্টেশনটি নির্মাণের পেছনের আসল গল্প। মানুষের পাশাপাশি এক দল রোবট বাহিনী ব্যবহার করে মাত্র ৩৮ মাসে এই অবিশ্বাস্য স্থাপনা নির্মাণ করেছে চীন।
দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের মূল ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে অবস্থিত চংকিং শহরটি জনসংখ্যা এবং প্রশাসনিক এলাকা উভয় দিক থেকেই দেশটির বৃহত্তম শহর ও অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি। এই শহরের দ্রুত বর্ধনশীল যোগাযোগ চাহিদা মেটাতে এবং উত্তর স্টেশনের ওপর চাপ কমাতে চংকিং ইস্ট রেলওয়ে স্টেশনটি তৈরি করা হয়েছে। এটি মূলত একটি বিশাল বহুমুখী ট্রানজিট কমপ্লেক্স, যা ২০২৫ সালের মে মাসে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। যেখানে বিশ্বের অনেক দেশ বড় বড় প্রকল্প শেষ করতে কয়েক দশক ধরে লড়াই করে, সেখানে চীন ১ দশমিক ২২ মিলিয়ন বর্গমিটারের এই বিশাল স্টেশনটি তৈরি করেছে মাত্র তিন বছরের সামান্য কিছু বেশি সময়ে।
১ দশমিক ২২ মিলিয়ন বর্গমিটার আয়তনের এই স্টেশনে রয়েছে ১৫টি প্ল্যাটফর্ম এবং ২৯টি ট্র্যাক, যা তিনটি রেল ইয়ার্ডে বিভক্ত। ব্যস্ত সময়ে (পিক আওয়ার) এটি প্রতি ঘণ্টায় ১৬ হাজার যাত্রী পরিচালনা করতে সক্ষম। ৮ তলা পর্যন্ত বিস্তৃত এই বহুতল কমপ্লেক্সে হাই-স্পিড রেল, সাধারণ রেল, মনোরেল, বাস ও ট্যাক্সির সমন্বিত সুবিধা রয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের মে মাসে নকশা চূড়ান্ত করার পর ২০২৫ সালের মে মাসের মধ্যে মাত্র ৩৮ মাসে এই প্রকল্পের সমাপ্তি সম্ভব হয়েছে একটি ‘রোবট বিপ্লব’-এর কারণে। গ্রীষ্মকালে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি চরম তাপমাত্রার মধ্যে রুক্ষ পাহাড়ি ভূখণ্ডে এই প্রকল্পটি পুরোপুরি রোবট বাহিনীর ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়েছে।
এই নির্মাণকাজে লেজার-গাইডেড ফোর-হুইল স্ক্রিড রোবট (যাতে লিডার, এআই এবং ফাইভ-জি প্রযুক্তি ছিল) মানুষের চেয়ে তিন গুণ দ্রুত এবং মিলিমিটার নিখুঁতভাবে কংক্রিট লেভেলিংয়ের কাজ করেছে, যা শ্রমিকের খরচ কমিয়েছে ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া ৮০০ কেজি ওজনের কাঁচের প্যানেলগুলো অত্যন্ত নিরাপদে এবং নিখুঁতভাবে স্থাপন করেছে গ্লাস ইনস্টলেশন রোবট, যা সাধারণের চেয়ে তিন গুণ দ্রুত এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি ৯০ শতাংশ কমিয়ে এনেছে। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল অমনিডাইরেকশনাল ওয়েল্ডিং রোবট এবং ২৪ ঘণ্টা টহল দেওয়া পাহারাদার রোবট।
চায়না রেলওয়ে ব্যুরোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রোবোটিক্স ব্যবহারের ফলে শ্রমিকের খরচ প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে, কাজের গড় দক্ষতা বেড়েছে তিন গুণ এবং নিরাপত্তাজনিত দুর্ঘটনা কমেছে ৯০ শতাংশ। চংকিং ইস্ট স্টেশন কেবল রোবটের ব্যবহার নয়, বরং শিল্পক্ষেত্রের যেকোনো বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে চীনের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ। সম্ভবত এই অভাবনীয় গতির কারণেই ইলন মাস্ক ভিডিওটি শেয়ার করতে বাধ্য হয়েছেন।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে ও সিনহুয়া
আরটিভি/এআর



