‘বাংলাদেশে ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্যের দিন শেষ’  

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬ , ০৬:৩৬ পিএম


‘বাংলাদেশে ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্যের দিন শেষ’  
ঢাকার সাবেক মার্কিন ডেপুটি চিফ অব মিশন জন এফ ড্যানিলোভিচ। ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের আগস্ট বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে বড় ধরনের পরিবর্তনের পর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ঢাকার পররাষ্ট্রনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ লক্ষ করা যাচ্ছে। ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, চীনের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোর এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি—সব মিলিয়ে এক জটিল কিন্তু কৌশলগত কূটনীতি পার করছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ঢাকার সাবেক মার্কিন ডেপুটি চিফ অব মিশন জন এফ ড্যানিলোভিচ বাংলাদেশের বর্তমান ভূরাজনীতি, ভারতের সাথে আইনি জটিলতা এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সাথে ঢাকার ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ করেছেন।

সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং ঢাকার পক্ষ থেকে তাকে ফেরত চাওয়ার আনুষ্ঠানিক আবেদনের বিষয়টি উঠে আসে। ড্যানিলোভিচের মতে, মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে নয়াদিল্লি আশ্রয় দেওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত ইতিহাস এবং ভূগোলের সূত্রে একে অপরের সাথে বাঁধা। তবে বর্তমান বিএনপি সরকার ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি 'ধীরে কিন্তু সুনির্দিষ্ট' নীতি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশে ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্যের দিন এখন স্পষ্টতই শেষ। শেখ হাসিনা এবং তার সহযোগীদের ভারতে অবস্থান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে, যা দুই দেশের সরকারই উপেক্ষা করতে পারবে না।

একই সাথে তিনি উল্লেখ করেন, ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশকে নিয়ে ছড়ানো বিভিন্ন অপপ্রচার ও 'মিসইনফরমেশন' ভারতীয় জনমতকে প্রভাবিত করেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশকে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত করার আলোচনা নিয়ে জোর গুঞ্জন চলছে। এটিকে ওয়াশিংটন কীভাবে দেখছে, এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ড্যানিলোভিচ ইতিবাচক মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশের বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। সেই হিসেবে চীন একটি বড় বাজার এবং বিনিয়োগের অন্যতম উৎস। মিয়ানমারে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে দেশটির সাথেও অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানো ঢাকার জন্য একটি স্বাভাবিক পদক্ষেপ হবে।

তবে এই অর্থনৈতিক করিডোর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো ফাটল ধরবে না বলেই তার বিশ্বাস। ড্যানিলোভিচ মনে করেন, বাংলাদেশ যদি চতুর ও দক্ষ কূটনীতির পরিচয় দিতে পারে, তবে চীনের সাথে এই অর্থনৈতিক যোগাযোগ ওয়াশিংটনের সাথে কোনো বিরোধের কারণ হবে না। এটি মূলত ঢাকার ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত পররাষ্ট্রনীতির ওপর নির্ভর করছে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে একটি মানবিক করিডোর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশে নানামুখী বিতর্ক রয়েছে। এ বিষয়ে ড্যানিলোভিচ বলেন, আন্তর্জাতিক সাহায্য কমে আসায় দীর্ঘ মেয়াদে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে বাংলাদেশের পক্ষে এককভাবে সামলানো অসম্ভব। তাই রাখাইনে পরিস্থিতি উন্নত করা এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির জন্য মিয়ানমার সরকার ও অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের সাথে যোগাযোগ বাড়ানো ঢাকার একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।

এই মানবিক করিডোর নিয়ে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার অনেকটুকুই ভুল তথ্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন। সামগ্রিকভাবে তিনি সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ভেতরের বাস্তব পরিস্থিতি পরিবর্তনের ওপর জোর দেন।

ভারত ও পাকিস্তানের চিরবৈরী সম্পর্কের কারণে সার্ক প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক পরিধি বাড়াতে আসিয়ান এবং ডি-৮ জোটের দিকে নজর দিচ্ছে বাংলাদেশ। আসিয়ানের অংশীদার হতে ঢাকা ইতিমধ্যে জোরালো লবিং শুরু করেছে, যা অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও বাড়িয়ে দেবে। ড্যানিলোভিচ বাংলাদেশের এই বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানান। বিশেষ করে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সভাপতি নির্বাচিত হওয়াকে তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে ঢাকার বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছেন।

২০২৪ সালের সরকার পরিবর্তনের পর থেকে ওয়াশিংটন ঢাকাকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করছে। ড্যানিলোভিচ যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা কৌশলগত অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা চলছে, যা দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও জোরদার করবে। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত গতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশি কমিউনিটি দুই দেশের জনগণের সম্পর্ক উন্নয়নে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

সূত্র: দ্যা ডেল্টাগ্রাম

 আরটিভি/এআর 

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission