ভেনেজুয়েলায় গত মাসে আঘাত হানা শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪ হাজার ১১৮ জনে পৌঁছেছে। ভয়াবহ এই দুর্যোগে আহত হয়েছেন আরও ১৬ হাজার ৭৪০ জন। হাজার হাজার মানুষ এখনো গৃহহীন। একই সঙ্গে দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে দেশটিতে মারাত্মক স্বাস্থ্য সংকটের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্থানীয় সময় শুক্রবার (১০ জুলাই) ভেনেজুয়েলার পার্লামেন্টের প্রধান হোর্হে রদ্রিগেজ যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে এ তথ্য জানিয়েছে।
হোর্হে রদ্রিগেজ পোস্টে লিখেছেন, ২৪ জুন পরপর আঘাত হানা দুটি ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪ হাজার ১১৮ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ৭৪০ জন আহত হয়েছেন। উপকূলীয় লা গুয়াইরার পুরো এলাকাজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েক হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ আছেন।
পোস্টে আরও লিখেছেন, এখন পর্যন্ত ৮৬ হাজার ৭৯৪টি পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৬ হাজার ৪৬২ জনকে। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৮৫৬টি ভবন। এর মধ্যে ১৯০টি ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে। ভূমিকম্পে গৃহহীন মানুষের জন্য ৮৯টি অস্থায়ী আশ্রয়শিবির খোলা হয়েছে।
গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, গত ২৪ জুন ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭ দশমিক ৫ মাত্রা ও ৭ দশমিক ২ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানে। দেশটিতে গত এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।
এতে উপকূলীয় লা গুয়াইরা রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংস হয়ে যায় এবং বহু উঁচু ভবনের আবাসিক ব্লক পুরোপুরি ধসে পড়ে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়াদের মধ্যে জীবিত থাকার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য হওয়ায় উদ্ধারকারী দলগুলো ‘জীবিত’ মানুষদের সন্ধানে অভিযান বন্ধ করে দিয়েছে। তবে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে এখনো ধ্বংসস্তূপে খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা। তারা আশা করছেন, জীবিত না হলেও অন্তত মরদেহ কিংবা দেহাবশেষ পাওয়া গেলে প্রিয়জনদের মর্যাদাপূর্ণভাবে দাফনের সুযোগ পাবেন।
এদিকে শুক্রবারও দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির রাজধানী কারাকাসের কেন্দ্রীয় এলাকায় ৩ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এতে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েকটি সুউচ্চ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন খালি করে দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটে রাষ্ট্রীয় সেবাব্যবস্থা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া ভেনেজুয়েলার জন্য এই বিপর্যয়ের পর পুনর্গঠন কার্যক্রম একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতিসংঘ বুধবার ভূমিকম্প-পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য জরুরি ভিত্তিতে দেশটির জন্য প্রায় ৩০ কোটি ডলার সহায়তার আবেদন জানিয়েছে। সংস্থাটির তথ্যমতে, ভূমিকম্পের পর ভেনেজুয়েলায় জরুরি সহায়তা প্রয়োজন এমন মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ।
বর্তমানে লা গুয়াইরা রাজ্যের বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় ভ্রাম্যমাণ রান্নাঘর, চিকিৎসাকেন্দ্র এবং অস্থায়ী হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছে। এই রাজ্যেই ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে।
জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিষয়ক কার্যালয় জানিয়েছে, বাড়িঘর ও অবকাঠামোর সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলার।
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজও বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ পুনরুদ্ধার করে তা ভূমিকম্প-পরবর্তী পুনর্বাসন কাজে ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন।
বুধবার তিনি জানান, যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার আওতায় আটকে থাকা ভেনেজুয়েলার প্রায় ৩০ টন সোনা ছাড় করতে তিনি ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লসের কাছে অনুরোধ করেছেন।
দেলসি রদ্রিগেজ জোড়া ভূমিকম্পের পর সরকারের জরুরি তৎপরতার পক্ষে সাফাই দিয়েছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, দেশটি আর সামাজিক অস্থিরতার দিকে যাবে না।
তবে অনেক ভেনেজুয়েলাবাসী অভিযোগ করেছেন, আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল আসার আগে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সরকারের দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যক্রম যথেষ্ট ছিল না। এ নিয়ে অনেকের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।
আরটিভি/টিআর




