১১ নারীকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার রসু খাঁ গ্রেপ্তারের দেড় যুগ পরও বেঁচে আছেন— এমন এক চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আবারও প্রশ্ন উঠছে আমাদের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে। সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে ৭ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় যখন দেশজুড়ে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে, তখন অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও সাজা কার্যকর না হওয়ার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
তদন্তে দেরি, রায়ের দীর্ঘসূত্রিতা এবং একের পর এক আপিলের বেড়াজালে বছরের পর বছর আটকে থাকছে চাঞ্চল্যকর সব মামলার সাজা। গত বছর ঘটে যাওয়া ৮ বছর বয়সী আছিয়া হত্যাকাণ্ডের আসামির ফাঁসির রায় হলেও সেটি এখনও আপিলেই ঝুলে আছে। আর দেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর সিরিয়াল কিলার রসু খাঁ গ্রেপ্তারের ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও তার চূড়ান্ত শাস্তি এখনও কার্যকর করা যায়নি।
চাঁদপুর সদরের মদনা গ্রামের বাসিন্দা রসু খাঁ শুরুতে ছিলেন একজন সাধারণ ছিঁচকে চোর। ২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর টঙ্গী থেকে একটি মসজিদের ফ্যান চুরির মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদের মুখে বেরিয়ে আসে এক গা শিউরে ওঠা অধ্যায়। রসু খাঁ নিজেই স্বীকার করেন— তিনি একে একে ১১ জন নারীকে ধর্ষণ ও খুন করেছেন। তার লক্ষ্য ছিল ১০১টি হত্যাকাণ্ড ঘটানো!
প্রেমে ব্যর্থ হয়ে এবং টঙ্গীতে এক পোশাকশ্রমিকের সঙ্গে প্রেম করতে গিয়ে গণপিটুনির শিকার হওয়ার পর নারীদের প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিশোধস্পৃহা তৈরি হয় তার মনে। এরপরই তিনি শপথ নেন, ১০১ জন নারীকে হত্যা করে মাজারে গিয়ে তওবা করবেন। সবাইকে প্রেমের অভিনয় ও বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলতেন রসু। ২০০৭ সালের শুরুতে নিজের শ্যালকের স্ত্রী রীনাকে হত্যার মধ্য দিয়ে তার এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড শুরু হয়।
রসু খাঁর লালসার শিকার হওয়া নারীদের প্রায় সবাই ছিলেন ১৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সী পোশাকশ্রমিক। এদের মধ্যে ফরিদগঞ্জে ৬ জন, চাঁদপুর সদরে ৪ জন এবং হাইমচরে ১ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করেন তিনি। শিকার হওয়া নারীদের বেশিরভাগেরই সঠিক পরিচয় না পাওয়ায় পরবর্তীতে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পুলিশকে বেশ বেগ পেতে হয়। তার বিরুদ্ধে মোট ১০টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৯টি হত্যা এবং ১টি নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের মামলা।
২০০৯ সালের ২০ জুলাই রাতে ফরিদগঞ্জের হাসা খালের পাশে পারভীন নামে এক পোশাকশ্রমিককে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করেন রসু খাঁ ও তার সহযোগীরা। এই মামলায় ২০১৮ সালের ৬ মার্চ চাঁদপুরের আদালত রসু খাঁসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন।
পরবর্তীতে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ৯ জুলাই হাইকোর্ট রসু খাঁর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। তবে হাইকোর্টের রায়ের পরও আজ পর্যন্ত তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়নি। অন্যদিকে, তার বিরুদ্ধে থাকা বাকি মামলাগুলোর অগ্রগতিও নামমাত্র।
৫২ বছর বয়সী রসু খাঁ বর্তমানে গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে (ফাঁসির সেল) বন্দি আছেন। কিছুদিন আগে তাকে কুমিল্লার কারাগার থেকে সেখানে স্থানান্তর করা হয়।
জানা গেছে, রসু খাঁ বর্তমানে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক আছেন। কারাগারের নিয়ম অনুযায়ী তাকে ভেতরের সাধারণ খাবারই খেতে দেওয়া হয়। তবে গ্রেপ্তার হওয়ার পর এই দীর্ঘ ১৮ বছরে কোনো স্বজন বা শুভাকাঙ্ক্ষী তাকে কারাগারে দেখতে আসেননি।
দেশের মানুষ এখন একটাই প্রশ্ন তুলছেন— এমন জঘন্য অপরাধের অকাট্য প্রমাণ এবং আদালতের রায়ের পরও কেন বছরের পর বছর বেঁচে থাকে রসু খাঁর মতো সিরিয়াল কিলাররা? দ্রুত সাজা কার্যকর না হলে এই ধরনের অপরাধ প্রবণতা কীভাবে কমবে, সেই জবাবই খুঁজছে সাধারণ মানুষ।
আরটিভি/এমএইচজে




