যেসব জিনিস মাথায় রাখবেন ঈদের কেনাকাটায়

আরটিভি নিউজ

মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬ , ০৭:২৩ পিএম


যেসব জিনিস মাথায় রাখবেন ঈদের কেনাকাটায়
প্রতীকী ছবি

ঈদ মানেই আনন্দ, উৎসব, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে মিলনমেলা এবং নতুন পোশাকের উচ্ছ্বাস। বিশেষ করে ঈদুর ফিতরকে ঘিরে আমাদের সমাজে কেনাকাটার একটি আলাদা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ছোট-বড় সবার জন্য নতুন জামা, জুতা, প্রসাধনী, উপহার— সব মিলিয়ে ঈদের আগে বাজারগুলো যেন রঙিন এক উৎসবের মঞ্চে পরিণত হয়। কিন্তু আবেগ আর তাড়াহুড়োর কারণে অনেক সময় আমরা এমন কিছু ভুল করি, যা পরে ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই ঈদের কেনাকাটায় কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি, যাতে আনন্দ থাকে অটুট, খরচ থাকে নিয়ন্ত্রণে।

১. আগে বাজেট, পরে বাজার

ঈদের কেনাকাটায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাজেট নির্ধারণ। মাসের নিয়মিত খরচ, যাকাত-ফিতরা, কোরবানি বা অন্যান্য ধর্মীয় দায়িত্ব— সব বিবেচনায় রেখে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ কেনাকাটার জন্য আলাদা করুন।

অনেকে ক্রেডিট কার্ড বা ধার করে বেশি খরচ করে ফেলেন, পরে মাসজুড়ে অর্থকষ্টে পড়েন। তাই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কেনাকাটা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। একটি ছোট তালিকা তৈরি করে নিলে অপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনা থেকে নিজেকে বিরত রাখা সহজ হয়।

২. কেনাকাটার সঠিক সময় নির্বাচন

ঈদের একেবারে শেষ মুহূর্তে বাজারে গেলে ভিড়, যানজট, পণ্যের স্বল্পতা— সব মিলিয়ে কেনাকাটা হয়ে ওঠে ক্লান্তিকর। সম্ভব হলে ঈদের অন্তত এক সপ্তাহ আগে প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার চেষ্টা করুন।

বড় শহরগুলোর জনপ্রিয় মার্কেটগুলো— যেমন ঢাকার বসুন্ধরা সিটি শপিং মল বা নিউ মার্কেট—ঈদের আগে অতিরিক্ত ভিড়ে উপচে পড়ে। তাই সময় বেছে গেলে যেমন স্বস্তি পাবেন, তেমনি ভালো পণ্যও বেছে নিতে পারবেন।

৩. প্রয়োজন বনাম চাহিদা

ঈদে সবাই নতুন পোশাক পরতে চায়, কিন্তু “ট্রেন্ডি” বা “দেখতে সুন্দর” বলেই সবকিছু কিনে ফেললে বাজেট নষ্ট হয়ে যেতে পারে। পরিবারের সদস্যদের প্রকৃত প্রয়োজন কী তা আগে বিবেচনা করুন।

শিশুদের জন্য পোশাক কেনার সময় একটু বড় সাইজ নেওয়া ভালো, কারণ তারা দ্রুত বড় হয়। আবার অফিসে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহারযোগ্য পোশাক কিনলে তা পরবর্তীতেও কাজে লাগবে।

৪. পণ্যের গুণগত মান যাচাই

দেখতে আকর্ষণীয় হলেই যে পোশাক বা জুতা টেকসই হবে— তা নয়। কাপড়ের মান, সেলাইয়ের দৃঢ়তা, রঙ স্থায়িত্ব— এসব খুঁটিনাটি খেয়াল করুন।

বিশেষ করে রেডিমেড পোশাক কেনার সময় ট্রায়াল দিয়ে দেখা জরুরি। অনেক সময় আলো-আঁধারিতে রঙ সুন্দর মনে হলেও বাসায় গিয়ে ভিন্ন মনে হতে পারে।

প্রসাধনী বা খাদ্যপণ্য কিনলে মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ দেখে নিন। ব্র্যান্ডের নাম দেখে নিশ্চিন্ত না হয়ে প্যাকেটের সিল ঠিক আছে কি না, সেটিও খেয়াল করুন।

৫. দরদাম করার কৌশল

ঈদের বাজারে অনেক দোকানি বাড়তি দাম হাঁকেন। তাই দরদাম করা জরুরি। একই পণ্য একাধিক দোকানে দেখে তুলনা করুন।

মার্কেটভেদে দামের পার্থক্য থাকতে পারে। পরিচিত দোকান বা নির্ভরযোগ্য ব্র্যান্ড থেকে কেনা নিরাপদ হলেও দাম যাচাই করা বুদ্ধিমানের কাজ।

৬. অনলাইন কেনাকাটায় সতর্কতা

বর্তমানে অনলাইনে ঈদের কেনাকাটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফেসবুক পেজ, ই-কমার্স সাইট— সবখানেই অফার আর ছাড়ের বিজ্ঞাপন।

তবে অনলাইনে কেনার আগে কিছু বিষয় মাথায় রাখুন:

রিভিউ পড়ুন

পণ্যের আসল ছবি আছে কি না দেখুন

রিটার্ন বা এক্সচেঞ্জ পলিসি জেনে নিন

অগ্রিম পুরো টাকা না দেওয়াই ভালো

অনেক সময় ছবির সঙ্গে বাস্তব পণ্যের মিল থাকে না। তাই নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম থেকে কেনাকাটা করাই নিরাপদ।

৭. নিরাপত্তা সবার আগে

ঈদের ভিড়ে পকেটমার বা ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়তে পারে। তাই কেনাকাটায় গেলে—

বড় অঙ্কের নগদ টাকা সঙ্গে না রাখা

মোবাইল ও মানিব্যাগ নিরাপদ স্থানে রাখা

শিশুকে চোখের আড়াল না করা

প্রয়োজনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যাওয়া

ব্যাংক কার্ড ব্যবহার করলে পিন নম্বর গোপন রাখুন।

৮. পরিবেশবান্ধব কেনাকাটা

ঈদের আনন্দের পাশাপাশি পরিবেশের কথাও ভাবা জরুরি। অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার না করে কাপড়ের ব্যাগ সঙ্গে রাখতে পারেন।

ফাস্ট ফ্যাশনের বদলে টেকসই ও মানসম্মত পোশাক কিনলে পরিবেশের ওপর চাপ কমে। এছাড়া স্থানীয় কারিগর বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্য কিনলে তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও সহায়তা হয়।

৯. পরিবারের সবার মতামত নিন

শিশু বা কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের পছন্দের পোশাক চাইতে পারে। তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিলে তারা খুশি হয়। তবে অভিভাবকদের দায়িত্ব হলো বাজেটের মধ্যে থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।

বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য আরামদায়ক পোশাক ও জুতা কিনতে ভুলবেন না। তাদের প্রয়োজন অনেক সময় আলাদা হয়। যেমন হালকা কাপড়, সহজে পরা-খোলা যায় এমন জুতা ইত্যাদি।

১০. ফিতরা ও দানকে অগ্রাধিকার দিন

ঈদের মূল শিক্ষা হলো সংযম ও সহমর্মিতা। তাই কেনাকাটার পাশাপাশি গরিব-দুঃস্থদের কথা ভাবা জরুরি।

রমজান শেষে ঈদের আগে ফিতরা আদায় করা সুন্নত। নিজের পরিবারের আনন্দের পাশাপাশি আশপাশের অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারলে ঈদের আনন্দ পূর্ণতা পায়।

কিছু পরিবার রয়েছে, যারা নতুন পোশাক কেনার সামর্থ্য রাখে না। সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের সহায়তা করলে সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।

১১. ভিড় ও স্বাস্থ্যবিধি

ঈদের বাজারে দীর্ঘ সময় ঘোরাঘুরি করলে ক্লান্তি, পানিশূন্যতা বা অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। তাই

প্রয়োজনে মাস্ক ব্যবহার করুন

বিশ্রামের জন্য বিরতি নিন

পর্যাপ্ত পানি পান করুন, হালকা খাবার খান (বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব দিন।)

১২. কেনাকাটার রসিদ সংরক্ষণ

অনেক সময় কেনা পোশাক বা জুতা বাসায় গিয়ে ঠিকমতো ফিট না-ও হতে পারে। তাই রসিদ সংরক্ষণ করুন, যাতে প্রয়োজন হলে পরিবর্তন করা যায়।

ব্র্যান্ড শপ থেকে কেনা পণ্যে সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এক্সচেঞ্জ সুবিধা থাকে। তবে শর্তগুলো ভালোভাবে পড়ে নিন।

১৩. ঈদের আসল আনন্দ ভুলবেন না

সবশেষে মনে রাখতে হবে ঈদ শুধু কেনাকাটার নাম নয়। নতুন জামা আনন্দের অংশ, কিন্তু আসল আনন্দ লুকিয়ে আছে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, নামাজ আদায়, কোলাকুলি আর ভালোবাসায়।

অতিরিক্ত কেনাকাটা বা অযথা প্রতিযোগিতায় না গিয়ে সরল ও পরিমিত জীবনযাপনই ঈদের সৌন্দর্য বাড়ায়। শিশুদেরও শেখান, ঈদের মানে শুধু দামি পোশাক নয় বরং কৃতজ্ঞতা, সহমর্মিতা ও পারিবারিক বন্ধন।

>>> ঈদের কেনাকাটা যেন আনন্দের উৎস হয়, দুশ্চিন্তার নয়—সেজন্য প্রয়োজন সচেতনতা ও পরিকল্পনা। বাজেট নির্ধারণ, সময়মতো বাজার করা, গুণগত মান যাচাই, নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং দানের গুরুত্ব বোঝা— এই কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখলেই কেনাকাটা হবে সহজ ও স্বস্তিদায়ক।

আসুন এবারের ঈদে আমরা অযথা অপচয় নয়, বরং দায়িত্বশীল কেনাকাটা ও মানবিক মূল্যবোধকে প্রাধান্য দিই। তবেই ঈদের আনন্দ হবে সত্যিকার অর্থে পূর্ণাঙ্গ ও শান্তিময়।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission