টিনশেড ঘর থেকে জেন-জিদের আইকন হয়ে ওঠা কে এই ওসমান হাদি?

আরটিভি নিউজ

শনিবার, ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ , ১২:৫৫ পিএম


টিনশেড ঘর থেকে জেন-জিদের আইকন হয়ে ওঠা কে এই ওসমান হাদি?
শরিফ ওসমান বিন হাদি। ফাইল ছবি

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদির জানাজা আজ শনিবার বাদ জোহর। এরপর তাকে সমাহিত করা হবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পাশে। নির্বাচনী প্রচারণা শেষে ফেরার পথে গুলিবিদ্ধ হয়ে ওসমান হাদির মৃত্যুর ঘটনায় এখন বিক্ষোভে উত্তাল সারাদেশ। দেশ-বিদেশে অনেকের মনেই প্রশ্ন, কে এই ওসমান হাদি? কেন তার এত জনপ্রিয়তা?

বিজ্ঞাপন

জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গঠিত সাংস্কৃতিক সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন শরিফ ওসমান হাদি। জুলাই শহীদদের অধিকার রক্ষা, আওয়ামী লীগ নিষেধাজ্ঞা আন্দোলন এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী সক্রিয় রাজনীতির কারণে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন তরুণ এ নেতা। পুরো দেশকেই নাড়িয়ে দিয়েছে তার হত্যাকাণ্ড।

ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায় এক মুসলিম পরিবারে ১৯৯৩ সালের ৩০ জুন জন্মগ্রহণ করেন শরিফ ওসমান হাদি। তার বাবা ছিলেন মাদরাসা শিক্ষক। শৈশব কেটেছে সীমিত আয়ের পারিবারে, সংগ্রামের ভেতর দিয়ে। টিনশেডের ছোট ঘরেই তার বেড়ে ওঠা। মাওলানা আব্দুল হাদি ও তাসলিমা হাদির ছয় সন্তানের মধ্যে সবার ছোট ওসমান হাদি। 

বিজ্ঞাপন

এলাকাবাসীর ভাষ্য, শৈশব থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ছিলেন হাদি।

শরিফ ওসমান হাদির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় নলছিটি ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসায়। সেখানে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা শেষে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদরাসায়। সেখান থেকে দাখিল ও আলিম পরীক্ষা সম্পন্ন করেন তিনি। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

রাজনৈতিক সংগ্রামের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চায়ও সক্রিয় ছিলেন হাদি। ফ্যাসিবাদী আমলেও তিনি কলম ধরেছিলেন। ‘সীমান্ত শরিফ’ ছদ্মনামে কবিতা লিখে শোষণ, নিপীড়ন ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন তিনি। ২০২৪ সালে দুয়ার প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় তার কাব্যগ্রন্থ ‘লাভায় লালশাক পুবের আকাশ’, যা পাঠকমহলে আলোচনার জন্ম দেয়। রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধেও তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট ও অনন্য।

পেশাগত জীবনে হাদি ইংরেজি শেখানোর একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন। সর্বশেষ তিনি ইউনিভার্সিটি অব স্কলারস নামে বেসরকারি এক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছিলেন। এই সময় তিনি ঢাকার রামপুরা এলাকায় বসবাস শুরু করেন। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় স্থানীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন এবং রামপুরা এলাকার সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে হওয়া আন্দোলনে হাদিকে অন্যতম তরুণ নেতৃত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার অভিজ্ঞতা ও দাবির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতি প্ল্যাটফর্ম ইনকিলাব মঞ্চ তার হাত ধরেই ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য ছিল- সব আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠন, যেখানে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ও ন্যায়বিচার হবে প্রধান মূল্যবোধ।

ইনকিলাব মঞ্চ গঠনের পর হাদি জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ, অপরাধীদের বিচার, আহত ও নিহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং জুলাই চার্টার ঘোষণার দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরেন। এসব দাবিই তাকে জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে সংহতি রেখে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে ইনকিলাব মঞ্চ। এর মধ্যে অন্যতম হলো, দেশব্যাপী গ্রাফিতি ও স্লোগান পুনর্লিখন কর্মসূচি, শহীদি সপ্তাহ পালন, দাবি আদায়ে অনশন, স্বাধীনতা সংগ্রামের ছবি প্রদর্শনী, ভিডিও ডকুমেন্টেশন, শহীদি স্মৃতিকথা, গণসেজদা ও দ্রোহের গান কর্মসূচি।

২০২৫ সালে আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রদ্রোহী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার দাবিতে ‘ন্যাশনাল অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ইউনিটি’ ব্যানারে গড়ে ওঠা দেশব্যাপী আন্দোলনে অন্যতম সক্রিয় সংগঠন হিসেবে অংশ নেয় হাদির ইনকিলাব মঞ্চ। এই আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের দমন-পীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের জন্য দলটিকে দায়ী করে নিষেধাজ্ঞার দাবি জানান হাদি। দাবি আদায় না হলে সচিবালয় ঘেরাওয়ের হুমকি দিয়েও আলোচনায় আসেন তিনি।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়েও সরব ছিলেন হাদি। সরকারের কাঠামোগত দুর্বলতা ও দৃশ্যমান পরিবর্তনের ঘাটতির সমালোচনা করে তিনি সব দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান করে একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন।

রাজনৈতিক জীবনের এক পর্যায়ে ওসমান হাদি জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন (মতিঝিল, শাহবাগ, রমনা, পল্টন ও শাহজাহানপুর) থেকে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন। প্রচলিত রাজনৈতিক ধারা ভেঙে তিনি এলাকাবাসীর সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়, ‘চা–সিঙাড়া’ আড্ডা এবং জনগণের পরামর্শ অনুযায়ী নির্বাচনি ইশতাহার তৈরির কথা জানান। তার এই ভিন্নধর্মী প্রচারণা নাগরিক সমাজে প্রশংসিত হয় এবং গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

নির্বাচনি প্রচারণার সময় কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে মুড়ি-বাতাসা বিতরণ, ফজরের নামাজের পর মসজিদের সামনে লিফলেট বিতরণ, ডোনেশনের মাধ্যমে ফান্ড সংগ্রহ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অর্থের হিসাব প্রকাশ তাকে জনপ্রিয় করে তোলে। এমনকি এক পর্যায়ে প্রচারণার সময় তার পকেটে একজন টাকা ঢুকিয়ে দিচ্ছেন- এমন একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

আরটিভি/এসএইচএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission