দেশে ‘পরিবেশ পুলিশ’ গঠনের উদ্যোগ

বাসস

সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬ , ০৬:৩৪ পিএম


দেশে ‘পরিবেশ পুলিশ’ গঠনের উদ্যোগ
পুলিশ সদর দপ্তর। ছবি: সংগৃহীত

পরিবেশ খাতে অপরাধ প্রতিরোধে একটি বিশেষায়িত পরিবেশ পুলিশ ইউনিট গঠনের প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের কাছে উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে প্রণীত এ প্রস্তাবটি আসন্ন পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হতে পারে।

সূত্র জানায়, রোববার (১৯ এপ্রিল) পুলিশ সদর দপ্তরে পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে নতুন এই পুলিশ ইউনিট গঠনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

প্রস্তাবিত ইউনিটের লক্ষ্য হলো দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত অপরাধ, যেমন- নদী দখল, শিল্প-কারখানার দূষণ, বন উজাড়, পাহাড় কাটা এবং অবৈধভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ মোকাবিলা করা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের অপরাধের ব্যাপ্তি ও জটিলতা এতটাই বেড়েছে, তা প্রচলিত পুলিশ ব্যবস্থার সক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। তাই একটি বিশেষায়িত বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা হলে পরিবেশগত অপরাধ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে, বিদ্যমান আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত হবে এবং দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষিত থাকবে।

দীর্ঘমেয়াদে এ উদ্যোগ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং ভবিষ্যতে পরিবেশগত দুর্যোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রস্তাবিত ইউনিট নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, পরিবেশগত আইন লঙ্ঘনের নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশে নদী দূষণ, অবৈধ পাহাড় কাটা ও বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত অপরাধসহ পরিবেশগত বিভিন্ন সংকট বেড়ে যাওয়ায় এ ধরনের ইউনিট গঠনের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত বেশি। কারণ বর্তমানে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে থাকা প্রচলিত পুলিশ বাহিনী এসব সমস্যা যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে পারছে না।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে পরিবেশ সুরক্ষায় বিশেষায়িত পুলিশ বা ইকোলজিক্যাল পুলিশ ইউনিট গঠন করেছে। এসব ইউনিট অবৈধভাবে বন উজাড়, বন্যপ্রাণী পাচার, দূষণ ও খনন কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কাজ করছে।

মঙ্গোলিয়া ২০১৭ সালে গোবি মরুভূমির জীববৈচিত্র্য রক্ষায় একটি ইকোলজিক্যাল পুলিশ ইউনিট গঠন করে। রুয়ান্ডা ও উগান্ডায় দূষণ, নির্গমন, জলাভূমি ও বন রক্ষায় পরিবেশ পুলিশ কাজ করছে। শ্রীলঙ্কায় অবৈধ বর্জ্য ফেলা ও বন উজাড়ের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করা হয়। নরওয়েতে পরিবেশগত অপরাধ দমনে বিশেষায়িত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা রয়েছে। 

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবদুর রশিদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, পরিবেশগত সমস্যা মোকাবিলায় একটি বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট গঠন ইতিবাচক পদক্ষেপ হবে। তবে পরিবেশ রক্ষায় সব অংশীজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং ২০২৩ সালের হালনাগাদ বিধিমালা ইতোমধ্যে একটি শক্তিশালী আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে। কিন্তু বিশেষায়িত প্রয়োগকারী ইউনিট না থাকায় এসব আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না এবং প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থাই বেশি দেখা যাচ্ছে।

তিনি পরিবেশ ও প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের (এনআরসিসি) সহকারী পরিচালক (গবেষণা ও পরিকল্পনা) মো. আশরাফুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, একটি পৃথক পুলিশ ইউনিট গঠন নদী ও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে। তবে নদী দখল ও দূষণ রোধে তাদের সুপারিশ বাস্তবায়নে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ অন্যান্য অংশীজনের সহযোগিতা প্রয়োজন। 

নদী দখল ও দূষণ প্রতিরোধে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি কাজ করছে।

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক জরিপের বরাত দিয়ে তিনি জানান, দেশে মোট ১ হাজার ৪১৫টি নদী রয়েছে, যার মধ্যে ৮০০টিরও বেশি নদী দখল ও দূষণের হুমকিতে রয়েছে।

হাজার হাজার অবৈধ স্থাপনার কারণে নদী ও খাল দখল হয়ে আছে। অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য, ট্যানারি বর্জ্য এবং পয়ঃনিষ্কাশন সরাসরি জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে, যা জলজ পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বন উজাড়ও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বনাঞ্চলের পরিমাণ আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক কম এবং অবৈধ কাঠ কাটার পাশাপাশি ভূমি দখল ও কৃষি সম্প্রসারণের কারণে তা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। পাহাড়ি অঞ্চলে পাহাড় কাটা ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। যার ফলে প্রতিবছর প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।

বায়ুদূষণও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, বিশেষ করে ইটভাটার কারণে বেশি বায়ুদূষণ হচ্ছে। দেশে ৭ হাজারের বেশি ইটভাটা রয়েছে, যার অনেকগুলোরই পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। নিম্নমানের জ্বালানি ও পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে এসব ভাটা শুষ্ক মৌসুমে শহরাঞ্চলে মারাত্মক বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুন

অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলনও একটি পরিবেশগত গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দারিদ্র্য, বিকল্প জীবিকার অভাব এবং স্বল্প শিক্ষা কার্যকর জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করছে, যা আইন প্রয়োগকে আরও জরুরি করে তুলছে।

দেশে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ বিদ্যমান থাকলেও যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় অনেক অপরাধী দায়মুক্তি পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকরা পরিবেশ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ পরিবেশ পুলিশ ইউনিট গঠনের পক্ষে মত দিচ্ছেন।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission