শ্রীলঙ্কান গণমাধ্যমের প্রতিবেদন

শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

রোববার, ১০ মে ২০২৬ , ০৬:২২ পিএম


শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান
প্রতীকী ছবি

দীর্ঘ কয়েক দশকের দূরত্ব ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন ঘুচিয়ে এবার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। এরই মধ্যে পারস্পারিক নিরাপত্তা ইস্যুতে যুগান্তকারী এক সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে দুই দেশ।

সম্প্রতি ঢাকায় স্বাক্ষরিত এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ তদন্ত ও নিরাপত্তা সমন্বয়ের আনুষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে এই সমঝোতা।

রোববার (১০ মে) এক নিবন্ধে এমনই তথ্য তুলে ধরেছে শ্রীলঙ্কান অনলাইন নিউজ ওয়েবসাইট শ্রীলঙ্কা গার্ডিয়ান। 

সংবাদমাধ্যমটির মতে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা সহযোগিতার দিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৪ সালে সংঘটিত জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এই প্রথম দুই দেশের মধ্যে প্রকাশ্যে স্বীকৃত দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠল।

গত শুক্রবার (৮ মে) ঢাকায় এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং এর মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের একটি কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থা চালু হচ্ছে। আর এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

শুক্রবার স্বাক্ষরিত এই সমঝোতা স্মারকে সই করেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন রাজা নাকভি। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি মাদকবিরোধী ও মানবপাচারবিরোধী সহযোগিতা হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও চুক্তির পরিধি সাধারণ আইনশৃঙ্খলা সহযোগিতার চেয়ে অনেক বিস্তৃত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ও আঞ্চলিক বিশ্লেষকেরা।

আরও পড়ুন

চুক্তির মূল বিষয় হচ্ছে— দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে আনুষ্ঠানিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও যৌথ সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এর আওতায় গোপন তথ্য আদান-প্রদান, তদন্ত কার্যক্রমে সমন্বয় এবং নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা তৈরির কথা বলা হয়েছে, যাতে দুই দেশের সংস্থাগুলোর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের কাঠামোবদ্ধ সহযোগিতা ১৯৭১ সালের পর ঢাকা ও ইসলামাবাদের সম্পর্কের ইতিহাসে বড় পরিবর্তন। স্বাধীনতার পর দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত যোগাযোগ ও নানা টানাপোড়েনের মধ্যে ছিল। এই কাঠামোয় দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে মাদক পাচার, আন্তঃসীমান্ত চোরাচালান ও সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে।

এতে ‘কন্ট্রোলড ডেলিভারি অপারেশন’ নামে পরিচিত একটি পদ্ধতিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের মধ্যে অবৈধ চালান অনুসরণ ও নজরদারি করা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও পাকিস্তানের অ্যান্টি-নারকোটিক্স ফোর্সের মধ্যে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণ বিনিময়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী চুক্তিতে এ ধরনের বিষয় সাধারণ হলেও, স্থায়ী গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও গোপন অপারেশনাল সমন্বয়ের বিষয়টি আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাদের মতে, এই চুক্তি কার্যত দুই দেশের মধ্যে আরও গভীর নিরাপত্তা সমন্বয়ের ভিত্তি তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে প্রতিবেশী দেশগুলোর গোয়েন্দা কার্যক্রম ও নিরাপত্তা কৌশলেও প্রভাব ফেলতে পারে।

এছাড়া চুক্তির সময়টিও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকার অপসারণের পর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। বঙ্গোপসাগরীয় নিরাপত্তা ও বাণিজ্যপথে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানের কারণে এই পরিবর্তনের দিকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলো নিবিড় নজর রেখেছে।

এই চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ায় পরিবর্তিত জোট রাজনীতিরও প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন ও বহিরাগত কৌশলগত স্বার্থ এখন ক্রমেই একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক বহু বছর ধরে সীমিত যোগাযোগ ও ঐতিহাসিক উত্তেজনার মধ্যে আটকে থাকলেও, নতুন এই সমঝোতা দুই দেশের সম্পর্কে ধীরে হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ উষ্ণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একে আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের মতে, মাদক পাচার ও চোরাচালান নেটওয়ার্ক রাজনৈতিক ইতিহাস মানে না, বরং সীমান্ত পেরিয়ে সক্রিয় থাকে।

তবে সমঝোতা স্মারকে যেভাবে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে, তাতে এটি শুধুমাত্র বিচ্ছিন্ন আইনশৃঙ্খলা সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় চুক্তির প্রভাব ঘোষিত উদ্দেশ্যের বাইরেও যেতে পারে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এটি মাদক ও মানবপাচারবিরোধী কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ, তবে নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা ও যৌথ তদন্ত কাঠামো ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত নিরাপত্তা সহযোগিতার ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা সহযোগিতার এটি একটি বিরল উদাহরণ। স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস ও পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা দীর্ঘদিন দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা যোগাযোগ সীমিত রেখেছিল।

পর্যবেক্ষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং মাদক পাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকির মতো অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশগুলো এখন দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার দিকে বেশি ঝুঁকছে।

তবে এই চুক্তির কৌশলগত প্রভাব এখনও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কারণ ভারতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে পাকিস্তান-বাংলাদেশ নিরাপত্তা সহযোগিতার পুনরুত্থান নতুন এক সমীকরণ তৈরি করতে পারে।

এখন পর্যন্ত দুই দেশই এই চুক্তিকে সীমিত ও কারিগরি সহযোগিতা হিসেবে তুলে ধরছে। কিন্তু এর গুরুত্ব শুধু ঘোষিত উদ্দেশ্যে নয়, বরং দীর্ঘদিন ইতিহাসনির্ভর সম্পর্কে আটকে থাকা দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা সংলাপ পুনরায় চালুর মধ্যেও নিহিত।

এমন অবস্থায় এই কাঠামো বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং ভবিষ্যতে এটি আইনশৃঙ্খলা সহযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে আরও বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপ নেয় কি না সেটাই এখন নজরে থাকবে।

আরটিভি/এসএইচএম

 

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission