দেশের মানুষের আস্থা ও নির্ভরতার অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯। প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় দুর্ঘটনা কিংবা যে কোন সংকটময় মুহূর্তে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার জন্য চালু হয়েছে এ সেবা। দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে ফোন করলেই মিলে যায় পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্সসহ নানা ধরনের সুবিধা।
রাজধানীর আব্দুল গণি রোডের পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে দেশের জনগণকে সপ্তাহের সাত দিন ২৪ ঘণ্টা এই সেবা প্রদান করা হয়। বর্তমানে মানুষ থানায় গিয়ে অভিযোগ করার চেয়ে ৯৯৯-এ অভিযোগ জানাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তবে, জরুরি সেবার জন্য চালু হওয়া এই গুরুত্বপূর্ণ নম্বরটি এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে অপ্রয়োজনীয় ও ভুয়া কলের কারণে।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ -এর পরিসংখ্যান বলছে, মোট কলের অর্ধেকের বেশি কলই প্রকৃত জরুরি সহায়তার জন্য আসে না। ফলে প্রকৃত বিপদগ্রস্ত মানুষের সহায়তা পেতে বিলম্ব হচ্ছে, বাড়ছে সেবাদানকারীদের ওপর চাপ।
পুলিশ জানিয়েছে, ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর চালু হওয়া এ সেবা মূলত পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা দেওয়ার জন্য কাজ করে। এছাড়া জমি বিরোধ, পারিবারিক সহিংসতা, দুর্ঘটনাসহ নানা অভিযোগও এখানে আসে। ১০০টি লাইনে তিন শিফটে ৪৫০ জন কর্মী সেবা দেন।
জুলহাস হাজী নামে এক ব্যক্তি বলেন, ভোলা থেকে ঢাকাগামী কর্ণফুলী-৩ লঞ্চে সাত মাস বয়সি এক শিশু গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে আমি ৯৯৯ ফোন করি। আমি ফোন দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই উদ্ধারকাজ শুরু হয়। শিশুটির অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। ৯৯৯ না থাকলে হয়তো তাকে বাঁচানো সম্ভব হতো না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জরুরি সেবার অধিকাংশ কলই অপ্রয়োজনীয়। অনেক সময় কেউ মোবাইল রিচার্জ চেয়েও ফোন করেন, কেউ আর্থিক সহায়তা চান, আবার কেউ সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে কল করেন। এমনকি ছোট শিশুর কান্না থামাতে অনেক অভিভাবক শিশুর হাতে ৯৯৯ নম্বর ধরিয়ে দেন। কিছু ক্ষেত্রে কলাররা ভুয়া তথ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিভ্রান্তও করেন।
এ বিষয়ে কলটেকার রতন হোসেন বলেন, একবার সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থেকে একজন কল করে আগুন লাগার খবর দেন। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে ফায়ার সার্ভিসকে জানাই। পরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। পরে আমাদেরকে ফোন করা ব্যক্তিটিকে ফোন দিলে নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
পুলিশ জানায়, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মোট কল এসেছে ৭ কোটি ১১ লাখ ৭১ হাজার ৪২২টি। এর মধ্যে সেবা প্রদান করা হয়েছে মোট ৩ কোটি ১৭ লাখ ৩৮ হাজার ৯২৭টি কলে, যা মোট কলের ৪৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। বিপরীতে সেবা প্রদান করা হয়নি এমন কল এসেছে ৩ কোটি ৯৪ লাখ ৩২ হাজার ৪৯৫টি, যা মোট কলের ৫৫ দশমিক ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ জরুরি সেবার তুলনায় অযাচিত ও অপ্রয়োজনীয় কলের সংখ্যাই বেশি। প্রকৃত জরুরি কল বা ‘ইমার্জেন্সি কল ফর সার্ভিস (সিএফএস)’ ছিল মোট ২৬ লাখ ৫৯ হাজার ৯৪টি। এসব কলের মধ্যে পুলিশের সহায়তা চেয়েছে ২২ লাখ ২৮ হাজার ৩৫টি, ফায়ার সার্ভিস সহায়তা চেয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৪৪৮টি, অ্যাম্বুলেন্স চেয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার ৬১১টি।
তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক হলো ফাঁকা কল ও প্রাঙ্ক কলের সংখ্যা। তথ্য অনুযায়ী, ফোন করার পর কথা বলেনি এমন কলের সংখ্যা ৩ কোটি ৭ লাখ ২৮ হাজার ৭২৯টি, প্রাঙ্ক কলের সংখ্যা ২৬ লাখ ৭৪ হাজার ১৬৭টি, মিস কলের সংখ্যা ৬০ লাখ ২৯ হাজার ৫৯৯টি। যা সব মিলিয়ে জরুরি সেবার কার্যক্রমে সময় নষ্ট এবং প্রকৃত জরুরি কল রিসিভের ক্ষেত্রে বড় চাপ তৈরি করছে।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর গণমাধ্যম ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আনোয়ার সাত্তার বলেন, আগে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত অপ্রয়োজনীয় কল আসত। বর্তমানে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ফলে তা কিছুটা কমে ৫০ শতাংশের কাছাকাছি এসেছে। কেউ বারবার বিরক্তিকর কল করলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেই নম্বর ব্লক করা হয়।
যদিও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১-এর ৭০ ধারায় অযৌক্তিক ও বিরক্তিকর ফোনকলকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে বাস্তবে এ আইনের প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায় না।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর প্রধান এবং পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মহিউল ইসলাম বলেন, অপ্রয়োজনীয় কলের কারণে বর্তমানে জরুরি কল রিসিভ করতে প্রায় দুই মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশ্বের কোথাও জরুরি সেবায় এত দীর্ঘ ওয়েটিং টাইম দেখা যায় না।
তিনি আরও বলেন, অনেক সময় কলকারী ব্যক্তি অশালীন ভাষাও ব্যবহার করেন, যা কলটেকারদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করে। তবে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পরিবর্তে আমরা সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জরুরি সেবা ৯৯৯ কেবল একটি ফোন নম্বর নয়, এটি মানুষের জীবনরক্ষার অন্যতম ভরসা। তাই এই সেবাকে কার্যকর রাখতে অপ্রয়োজনীয় ও ভুয়া কল থেকে বিরত থাকা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
আরটিভি/এসএস




