ঢাকা মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

হাওরের সমস্যা চিহ্নিত করতে স্পেশাল ট্রাস্কর্ফোস গঠনের আহ্বান ডেপুটি স্পিকারের

নিজস্ব প্রতিবেদক, আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৬, ০৭:৪১ পিএম
বক্তৃতা দিচ্ছেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল : ছবি আরটিভি

স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত হাওরাঞ্চল ঘিরে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

তিনি বলেন, হাওরের মানুষ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও যুগের পর যুগ অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন। কিন্তু যারা হাওরাঞ্চল নিয়ে কাজ করছেন তারা কতটুকু করবেন তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। কেননা হাওরাঞ্চলের ভুক্তভোগী মানুষদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অনেক সময় জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় সংসদদের সঙ্গেও আলোচনা করার প্রয়োজন অনুভব করেন না সংশ্লিষ্টরা। এ সময় তিনি হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবীকা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদী, টেকসই ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নাই বিবেচনায় নিয়ে একটি ‘স্পেশাল ট্রাস্কফোর্স গঠন করার আহ্বান জানান।

রোববার (১৭ মে) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘হাওরের দুর্যোগ : ‘চাষাভুষার সন্তান’ গ্রন্থের প্রাসঙ্গিকতা ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে নেত্রকোনা সাংবাদিক ফোরাম-ঢাকা।

আরও পড়ুন

সংগঠনের সভাপতি রফিক মুহাম্মদের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য ডা. আনোয়ারুল হক, আলোচক হিসেবে অংশ নেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, শহীদুল্লাহ ফরায়জী, সাংবাদিক ফারুক আহমেদ তালুকদার, মাসুদ করিম, রাজন ভট্টাচার্য ও বাহরাম খান এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক কায়েস আজাদ আশরাফী প্রমুখ। সেমিনারে কী-নোট উপস্থাপন করেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক মুহাম্মদ মোফাজ্জল।

কায়সার কামাল বলেন, আমার জন্ম ও বেড়ে উঠা হাওরের মাঝখানে। ছোট বেলা থেকেই আমি হাওরের মানুষের কষ্ট, সংগ্রাম ও বঞ্চনার চিত্র কাছ থেকে দেখে আসছি। আমাদের কৃষক ও চাষীরা প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। অথচ স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত হাওরাঞ্চলের জন্য কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যখন ক্ষতি হয় তখনেই শুধু হাওর নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ যা থাকে অনুপস্থিত।

নিজেকে কৃষকের সন্তান দাবি করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, চাষাভুষার সন্তান গ্রন্থে হাওরাঞ্চলের বাস্তবতা, মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং দুর্যোগের বহুমাত্রিক প্রভাব অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে উঠে এসেছে। এই ধরণের গবেষণাধর্মী গ্রন্থ নীতিনির্ধারণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

হাওরাঞ্চলে মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে কায়সার কামাল বলেন, লিজ ব্যবস্থার মাধ্যমে এক শ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তি হাওরের সম্পদ দখল করছে। এতে প্রকৃত জেলেরা বঞ্চিত হচ্ছেন। বিলের মধ্যে বড় গর্ত করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়ায় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। হাওরের কৃষকরা উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পান না। আবার লিজ ব্যবস্থার কারণে মাছ ধরার অধিকার থেকেও বঞ্চিত হন। এসব বৈষম্যের তিনি নিজেও সাক্ষী।

তিনি বলেন, এখন আবার নতুন আরেকটা কথা চালু হয়েছে। যেমন আমার কিছু কিছু এলাকায় আছে ৪৩ কেজি তে মন। এটা অনেকে হয়ত বুঝেন না। কৃষকের ধান ৪৩ কেজি নিচ্ছে। মজুদদার কিন্তু ওটাকে ৪০ কেজিতে এক মণ হয় ৪০ কেজি দাম দিচ্ছে। এই যে কৃষকদের উপরে একটা সিস্টেমেটিক্যালি অত্যাচার করা হচ্ছে, নিপীড়ন করা হচ্ছে সেই জিনিসগুলা জাতীয়ভাবে এড্রেস হচ্ছে না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রী চেষ্টা করছেন; সকলকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে যদি আমরা কাজ করি তাহলে আমাদের নিজেদের জন্য যতটুক না পারি আমাদের সন্তানদের জন্য আগামী একটা মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।

আরও পড়ুন

নেত্রকোণা জেলা বিএনপির সভাপতি ও সংসদ সদস্য ড. আনোয়ারুল হক বলেন, হাওর জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আগাম বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে হাওরের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার নেতিবাচক প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতে পড়ে। তাই হাওর রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। এ সময় তিনি হাওর অধিদপ্তরের কাজের সমালোচনাও করেন।

তিনি বলেন, হাওরে যত উন্নয়ন হয়েছে বাস্তবিক অর্থে উন্নয়নের নামে ক্ষতি সাধন হয়েছে। সরকারের কোটি কোটি টাকা গচ্ছা গেছে শুধুমাত্র হাওরাঞ্চলের রাস্তা মেরামতে। বিগত সময়ে হাওরের উন্নয়ন সাধনে লুটপাট হয়েছে; হাওরবাসীর কোনো উন্নয়ন হয়নি।

লেখক ও অর্থনীতি অধ্যাপক আনু মুহম্মদ বলেছেন, ব্যক্তি স্বার্থে উন্নয়ন যদি সামষ্ঠিক ক্ষতি হয় সেই উন্নয়ন রাষ্ট্রের কোনো মঙ্গল আনে না। সাবেক রাষ্ট্রপতি হাওরাঞ্চলে যে দৃশ্যমান উন্নয়ন করেছে তা জীববৈচিত্র্যর জন্য বর্তমানে ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।

হাওরাঞ্চলে ফসলহানি বা মৎস্যসম্পদ ধ্বংসকে আনু মুহাম্মদ কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখেন না। তার মতে, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, ভুল কৃষিনীতি, অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নির্বিচার উন্নয়নের ফলে এই সংকটগুলো তৈরি হয়। হাওরের ফসল রক্ষার জন্য প্রতি বছর বাঁধ নির্মাণে বড় অঙ্কের বরাদ্দ দেওয়া হলেও ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে বাঁধগুলো স্থায়ী হয় না। সঠিক সময়ে কাজ শেষ না হওয়া এবং নিম্নমানের কাজের ফলে অকাল বন্যায় কৃষকদের বোরো ফসল তলিয়ে যায়। অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও পরিবেশবিনাশী কর্মকাণ্ডের কারণে হাওরের জীববৈচিত্র্য, মাছ এবং দেশীয় জলজ সম্পদ ধ্বংসের মুখে পড়ছে।

তিনি বলেন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় হাওরের নদী খনন করা, পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা, স্থানীয় কৃষকদের যুক্ত করে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার তদারকি করা এবং হাওরের বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করা জরুরি।

গীতিকবি ও রাষ্ট্রচিন্তক শহীদুল্লাহ ফরায়জী বলেন, আমরা দীর্ঘ ৫৫ বছরে সরকার পেয়েছি; দলীয় সরকার কিন্তু জনগণের সরকার পাইনি। রক্ত দেয় জনগণ আর সরকার হয় কোনো একটি দল। যাকে সম্মান করা যাকে মাথায় তুলে রাখা সেই কৃষককে আমরা পায়ের নিচে মেরে দিচ্ছি। এমন রাষ্ট্রের জন্য তো ৭১, ৯০ এবং সবশেষ ২০২৪ সালে গণঅভ্যুস্থানে জনগণ রক্ত দেয়নি। আমাদেরকে এমন একটি রাষ্ট্র গঠন করতে হবে যেখানে উৎপাদনমুখী সমাজ ও সংস্কৃতি বিকশিত হবে।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, বক্তারা হাওর বিষয়ক পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের দাবিও জানান। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বিজ্ঞানভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আরটিভি/এমএম

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
‘ঘর থেকেই শুরু করি, দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ি’ প্রতিপাদ্যে দেশজুড়ে দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত
‘ঘর থেকেই শুরু করি, দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ি’ প্রতিপাদ্যে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সারাদেশে ‘আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস’ পালন করা হয়েছে।
‘ঘর থেকেই শুরু করি, দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ি’ প্রতিপাদ্যে দেশজুড়ে দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের মন্ত্রীর সাক্ষাৎ, বাণিজ্য-বিনিয়োগে আগ্রহ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন নেদারল্যান্ডসের বৈদেশিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতাবিষয়ক মন্ত্রী শুর্দ শুর্দসমার নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদল। 
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের মন্ত্রীর সাক্ষাৎ, বাণিজ্য-বিনিয়োগে আগ্রহ
গ্রাম পুলিশ মহাসমাবেশ ৭ নভেম্বর
সারা দেশ থেকে আসা প্রায় ৪৭ হাজার গ্রাম পুলিশকে নিয়ে রাজধানীতে আগামী ৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মহাসমাবেশ। স্থানীয় সরকার বিভাগের ব্যবস্থাপনায় শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রসংলগ্ন মাঠে অনুষ্ঠেয় এই মহাসমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত থাকবেন।
গ্রাম পুলিশ মহাসমাবেশ ৭ নভেম্বর
‘জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে’
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সচিবালয়ে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) চিফ রিপ্রেজেনটেটিভ জুনকো তাকাহাশির সঙ্গে বৈঠকে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। 
‘জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে’
জাতীয় তথ্যচিত্রে মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি ৯০ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস অন্তর্ভুক্তে গুরুত্বারোপ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জাতীয় তথ্যচিত্র নির্মাণে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি নব্বইয়ের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস অন্তর্ভুক্তের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
জাতীয় তথ্যচিত্রে মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি ৯০ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস অন্তর্ভুক্তে গুরুত্বারোপ
আরও পড়ুন
‘বৃক্ষ হত্যাকারীদের’ ধরতে প্রশাসনকে ৪৮ ঘণ্টার সময় দিলেন ডেপুটি স্পিকার
শুধু অবকাঠামো নয়, শিক্ষার গুণগত ও মানবিক উন্নয়ন করতে হবে: ডেপুটি স্পিকার 
ভারতে স্বাধীনতা দিবসে কংগ্রেস নেতাকে ছেলেসহ কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা
টানা দ্বিতীয় বছর লালকেল্লার স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত রাহুল-খাড়গে