মোংলায় কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন কার্যালয়ের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলাম বলেছেন, দেশে অবৈধ পুশইন ঠেকাতে স্থলের পাশাপাশি জলসীমাতেও কঠোর নজরদারি অব্যহত থাকায় পুশইন অপচেষ্টা সফল হচ্ছে না। জলসীমার নজরদারিতে ব্যবহার করা হচ্ছে অত্যাধুনিক ড্রোন ও সার্ভিলেন্স প্রযুক্তি।
শুক্রবার (১২ জুন) বাগেরহাটের মোংলায় কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন তিনি।
তিনি বলেন, দেশের সমুদ্রসীমা, উপকূলীয় অঞ্চল এবং নদীতীরবর্তী সীমান্ত এলাকায় অবৈধ অনুপ্রবেশ ও অপরাধ দমনে কোস্টগার্ড সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সাতক্ষীরার মান্দারবাড়ি দিয়ে আগে পুশইনের ঘটনা ঘটায় সেখানেও সতর্ক অবস্থান নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি, আধুনিক ড্রোন ও সার্ভেলেন্স প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিশেষ ও যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন সীমান্তে ভারতের পুশইন চেষ্টায় অস্থিরতা শুরু হয়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) দৃঢ়তার সঙ্গে পুশইন চেষ্টা প্রতিহত করছে। এরইমধ্যে জলসীমায় সক্রিয়তার কথা জানিয়েছে কোস্টগার্ড।
সাংবাদিকদের জোনাল কমান্ডার মেসবাউল আরও বলেন, সুন্দরবনে ইলিশ-মাছ ধরার মৌসুম এবং মধু সংগ্রহের সময় দস্যুদের তৎপরতা বেড়ে যায়। এসব সময়ে বিপুলসংখ্যক জেলে, মৌয়াল ও বনজীবী সুন্দরবনে প্রবেশ করেন। তাদের লক্ষ্য করেই অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও চাঁদাবাজির পরিকল্পনা করে দস্যুরা। বর্তমানে সরকার ঘোষিত তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় বনজীবীদের প্রবেশ সীমিত রয়েছে। ফলে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও কমে এসেছে। তবে মৌসুম শুরু হলে দস্যুরা আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে। তবে কোস্টগার্ডের তৎপরতার কারণে দস্যুরা এখন আগের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। তাদের চলাচল, অস্ত্র সরবরাহ, অর্থ সংগ্রহ এবং সংগঠন পরিচালনার সক্ষমতা কমে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, এ চাপের মুখেই সুন্দরবনের কুখ্যাত ‘ছোট সুমন বাহিনীর’ প্রধান সুমন হাওলাদার ও তার সহযোগীরা গত ১৭ মে কোস্টগার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আত্মসমর্পণের পর অনেকেই কর্মসংস্থানের সুযোগ পান না। সমাজও তাদের সহজভাবে গ্রহণ করতে চায় না। সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার অভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং ব্যক্তিগত মানসিক সমস্যার কারণে কেউ কেউ আবার অপরাধের পথে ফিরে যায়।
কোস্টগার্ড জানায়, বর্তমানে সুন্দরবনে ছয় থেকে আটটি দস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। প্রতিটি বাহিনীতে সাধারণত ৮ থেকে ১০ কিংবা ১২ জন সদস্য থাকে। অনেক ক্ষেত্রে বড় বাহিনীগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল থেকে ছোট ছোট উপদল বা ‘ক্লোন’ বাহিনী তৈরি হয়। এসব বাহিনী মূলত জেলে ও মৌয়ালদের লক্ষ্য করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।
ক্যাপ্টেন মেসবাউল বলেন, বনজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য সরু খাল ও ন্যারো চ্যানেলকে আত্মগোপনের স্থান হিসেবে ব্যবহার করে দস্যুরা। জোয়ারের সময় যেসব পথে নৌকা চলাচল করে, ভাটার সময় সেগুলোর অনেক অংশ শুকিয়ে যায়। ফলে বড় বোট বা জাহাজ নিয়ে সেখানে প্রবেশ করা সম্ভব হয় না। তবে বর্তমানে ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব দুর্গম এলাকাও নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।
এছাড়া অপহরণের ঘটনা বনের ভেতরে ঘটলেও মুক্তিপণের টাকা অনেক সময় মংলা, বরগুনা, পাথরঘাটা কিংবা খুলনা শহরের বিভিন্ন এলাকায় হাতবদল হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই কোস্টগার্ড কর্মকর্তা বলেন, মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে পাঠানো মুক্তিপণের অর্থের গতিপথ অনুসরণ করে একাধিক সহযোগীকে শনাক্ত ও গ্রেফতার করা হয়েছে। বনের ভেতরের দস্যুদের পাশাপাশি স্থলভাগে থাকা সহযোগী চক্রের বিরুদ্ধেও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। এ সহযোগী চক্রের ইন্ধনেই মোংলায় জয়মনিঘোল এলাকায় কোস্টগার্ডের হারবারিয়া স্টেশনে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনা ঘটেছে।
কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সুন্দরবনে পরিচালিত অভিযানে ৪২টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ১০ রাউন্ড গুলি, ২৫০ রাউন্ড কার্তুজ, ৯৩ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, ১৯৪ রাউন্ড এয়ারগানের গুলি, ককটেল, টেলিস্কোপ এবং দুটি ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে ৩৯ জন বনদস্যু ও জলদস্যুকে আটক করা হয়েছে। তাদের কবল থেকে ৪১ জন জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
তিনি আরও বলেন, দেশের সমুদ্রসীমা, উপকূলীয় অঞ্চল এবং নদীতীরবর্তী সীমান্ত এলাকায় অবৈধ অনুপ্রবেশ ও অপরাধ দমনে কোস্টগার্ড সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সাতক্ষীরার মান্দারবাড়ি দিয়ে আগে পুশইনের ঘটনা ঘটায় সেখানেও সতর্ক অবস্থান নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি, আধুনিক ড্রোন ও সার্ভেলেন্স প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিশেষ ও যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
আরটিভি/ এসকেডি




